ওভিডের রূপান্তর: বই ১
ইউরোপ ইসলাম ইন্ডিয়া (ইইই) এই তিন কালচার গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র মেঘনা এই তিন নদীর মতো এক স্রোতে মিলে যেখানে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে সেই মোহনায় পৌঁছানোর জন্য আমি ইইই নামে একটা পলিটিকেল সিরিজ লেখা শুরু করছি। এই সিরিজের সব লেখা আমার পার্সোনাল ওয়েবসাইট মানসরোবরে (যে-হ্রদের আশপাশ থেকে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের জন্ম তার নামে) থাকবে। সিরিজের প্রস্তুতি হিসাবে রোমান কবি ওভিডের ৮ সালে প্রকাশিত মহাকাব্য ‘মেটামর্ফোসিজের’ (রূপান্তর) ১ম বইয়ের (খণ্ড) বাংলা অনুবাদ মানসরোবরে প্রকাশ করলাম। বাকি আছে আরো চৌদ্দটা বই। এই অনুবাদ কেন ইইই সিরিজের জন্য প্রাসঙ্গিক তা বলা দরকার।
ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত যে-কালচার আছে তার একটা অংশ এক সুতায় গাঁথার চেষ্টা করেছিলেন ইতালির লেখক-পরিচালক পিয়ের পাওলো পাসোলিনি। পাসোলিনির তিনটা সিনেমা ইংল্যান্ডের ‘ক্যান্টারবেরি টেইলস’ ইতালির ‘ডেকামেরন’ আর মধ্যপ্রাচ্যের ‘এরাবিয়ান নাইটস’ এক পর্দায় নিয়ে এসেছিল। এই তিন সাহিত্যের মধ্যে মিলের রহস্য যদি ভেদ করতে চাই তাহলে আরো পিছাতে হবে, চলে যেতে হবে প্রাচীন ইতালির ‘মেটামর্ফোসিজে’, বা তারও আগে প্রাচীন ভারতের ‘মহাভারতে’। এই হলো ইইই’র সাথে ওভিডের কানেকশনের কারণ। সরাসরি কোনো কানেকশন নাই, আমার বানানো কানেকশন, ঠিক যেমন ইইই’র তিন কালচারের মধ্যে কানেকশন বানানোটাও হবে একটা ক্রিয়েটিভ কাজ, একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত নীরস সত্য না। এবার অনুবাদ নিয়ে বলা দরকার।
অনুবাদ করা হয়েছে লাইন-বাই-লাইন, মানে ওভিডের যে লাইনে যা আছে আমার অনুবাদের সেই লাইনেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাই আছে, ব্যতিক্রম কম তবে আছে। ওভিডের বাক্যের যেখানে শুরু আর শেষ আমার বাক্যেরও সেখানেই শুরু আর শেষ, প্রায়। মেটামর্ফোসিজের ছন্দ ছিল প্রাচীন গ্রিক এপিকের ছন্দ, নাম ড্যাক্টাইলিক হেক্সামিটার, কারণ তার প্রতি লাইনে ৬টা পদ থাকে, প্রথম ৫ পদে ৩টা করে সিলেবল থাকে, আর শেষ পদে থাকে ২ সিলেবল। এই ১৭ সিলেবলের লাইন বাংলায় প্রকাশ করতে হলে যে ছন্দ বেছে নেয়া দরকার তা হলো জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’র প্রধান ছন্দ, যেখানে মাত্রার সংখ্যা ২২। অতএব বাংলা অনুবাদে একেক লাইনে সিলেবলের সংখ্যা একেক রকম, কিন্তু মাত্রা সব সময় ২২ (৮+৮+৬: হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে)। হিসাব করলে হয়ত দেখা যাবে, অনেক লাইনে ল্যাটিনে যে-কয় সিলেবল ছিল বাংলাতেও সে-কয়টাই আছে। যদি থাকে তা কাকতালীয়।
আমি অনুবাদ করছি একটা বিশাল গুগল শিটে যেখানে আমার বাংলা (২০২৪), ইয়োহান ভিলহেল্ম বাউরের ইলাস্ট্রেশন (১৭০৩), ওভিডের ল্যাটিন (৮), লাইন নাম্বার, এবং কিছু প্রপার নাউন রোমান হরফে পাশাপাশি পাঁচ কলামে পাওয়া যাবে (লিংক উপরে)। এই ওয়েবপেইজে যা প্রকাশ করলাম তা প্রায় ছাপানো বইয়ের মতো মৃত (মানে আর পাল্টানো হবে না), কিন্তু গুগল শিটের অনুবাদ থাকবে জীবিত, মানে পরিবর্তনযোগ্য। তার মানে যেকোনো সময় শিটের অনুবাদের যেকোনো লাইন পাল্টে যেতে পারে, অন্তত আমি যতদিন বেঁচে আছি। কেউ আবার ভেবে বসবেন না আমি ল্যাটিন থেকে সরাসরি অনুবাদ করছি একা। না। অর্থ বুঝার জন্য ইউজ করছি ফ্র্যাংক মিলার, ম্যারি ইনেস, বা চার্লস মার্টিনের ইংলিশ অনুবাদ, আর সরাসরি ল্যাটিন থেকে পারপ্লেক্সিটি, চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই ও গ্রকের করা ইংলিশ ও বাংলা অনুবাদ। এটা একটা কম্পিউটার গেইম, আর কিছু না! পড়া শুরুর আগে ওভিড ও তার রূপান্তর নিয়ে কিছু বলা দরকার।
সম্রাট অগাস্টাস যাকে রোম থেকে বহুদূরে কৃষ্ণ সাগরের পারে নির্বাসিত করেছিলেন সেই ওভিডের মেটামর্ফোসিজ প্রায় আড়াইশ রূপান্তরের গল্প। প্রায় প্রত্যেক গল্পে মানুষ রূপান্তরিত হয়ে যায় গাছ পাথর পশু পাখি ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসে তার মানসিক কষ্ট অনুতাপ উদ্বেগের কারণে, বা শাস্তি হিসেবে। ইমোশন এত কঠিন জিনিস যে মানুষ ‘অধিক শোকে পাথর’ পর্যন্ত হয়ে যায়, ওভিডের গল্প এই ‘পাথর হয়ে যাওয়াকে’ মনের অবস্থা থেকে নিরেট বাস্তবতায় পরিণত করে। মিথের মুখ আর ফোকের শ্রুতি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া আড়াইশ গল্পের মাধ্যমে ওভিড মহাবিশ্বের সৃষ্টি থেকে শুরু করে তার সময়কাল পর্যন্ত মানুষের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন, আক্ষরিক ইতিহাস না, পৌরাণিক ইতিহাস, এবং সেই কারণে মানসিক ইতিহাস, কল্পনার ইতিহাস। মহাভারত যেমন ইন্ডিয়ান মনের ইতিহাস, ‘রূপান্তর’ তেমনই ইউরোপিয়ান মনের ইতিহাস, আর ‘এরাবিয়ান নাইটস’ (আলফ লায়লা ওয়া লায়লা) মুসলমান মনের ইতিহাস। রূপান্তরের এই প্রথম বই শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের সৃষ্টি দিয়ে আর শেষ হয়েছে ইন্ডিয়া অভিযান দিয়ে। আর কিছু বলতে চাই না, বাকিটা ওভিডই বলুক, তবে একুশ শতকের এপার বাংলায়।
আমার মন চাইছে বলতে নতুন রূপে রূপান্তরিত
বস্তুর কথা; রূপ বদলের রূপকার হে সব দেবতা,
আমার মহাকাব্য অনুপ্রাণিত করে অবাধে বহাও
মহাবিশ্বের শুরু থেকে আমাদের বর্তমান অবধি।
সমুদ্র মাটি আর সব-ঘেরা আকাশের জন্মের আগে
দুনিয়ার সবখানে প্রকৃতি দেখাত কেবল এক রূপ,
যার নাম কেয়স: খাপছাড়া জিনিসের রুক্ষ পিণ্ড,
এক গাদা অচেতন পদার্থ যার বেমানান মৌলের
পরস্পরবিরোধী সব বীজ এক জঞ্জালে একাকার।
তখনো পৃথিবীতে আলো দেয়নি সূর্যদেবতা টাইটান,
তখনো চিকন শিং নতুন করত না চাঁদের দেবী ফিবি,
তখনো পৃথিবী তার নিজের ওজনে শূন্যের মাঝখানে
ঝুলতে শুরু করেনি, আর সমুদ্রের দেবী আম্ফিত্রিতি
দিঘল দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেনি মাটির সীমান্ত;
জল স্থল আর অন্তরীক্ষ যে তখন ছিল না তা নয়,
তবে সেই স্থল ছিল অস্থির, জল সাঁতারের অযোগ্য,
বাতাস অন্ধকার; এক রূপে সুস্থির থাকত না কিছু,
সবার সাথে সবার দ্বন্দ্ব, কারণ এক দেহের ভিতরে
যুদ্ধ করত গরমের সাথে শীত আর শুষ্কের সাথে
সিক্ত, কঠিনের সাথে কোমল আর হালকার সাথে ভারী।

এক খোদা (বা আরো দয়াল প্রকৃতি) এই বিরোধ মিটান,
তিনি ছিন্ন করেন আকাশ থেকে মাটি, মাটি থেকে সাগর;
ঘন বায়ুমণ্ডল থেকে তরল মহাশূন্য আলাদা করেন।
যখন অন্ধ স্তূপ থেকে সব ভাগ করে মুক্ত করেন,
যার যার জায়গায় সবাই সুরেলা বন্ধনে বাঁধা পড়ে।
আগুনের মত ভরহীন উপাদান ইথার সবার আগে
এক লাফে স্বর্গের ছাদে অধিকার করে তার জমি,
ওজনের দিক দিয়ে তার ঠিক পরে আসে বাতাসের স্থান,
মাটি এর চেয়ে ভারী, সে অন্য সব ভারী উপাদান নিয়ে
নিজের ভারে সবার কেন্দ্রে আসন গাড়ে, সব-ঘেরা জল
শেষ জায়গাটা নিয়ে আবৃত করে রাখে কঠিন ভূমিকে।
এভাবে সেই দেবতা (তা তিনি যিনিই হন) জগৎ সাজান,
কেয়সকে ভাগ করে অংশগুলোর বিবাদ দূর করেন,
এবং সবার আগে এক বিশাল গোলক হিসেবে পৃথিবী
তৈরি করেন যাতে তা এক রকম হয় সব দিক থেকে।
তারপর জলকে আদেশ করেন ছড়িয়ে পড়তে, ঝড়ের
টানে উত্তাল হয়ে পৃথিবীর সব তীর ঘেরাও করতে।
তিনি বানিয়েছিলেন সচল ঝরনা, নিশ্চল দিঘি হ্রদ,
দু-পারের পাহারায় বেঁধেছিলেন নিম্নগামী সব নদী,
শত ধারায় ধাবিত যাদের পানি কিছুটা শুষে নেয় মাটি,
আর বাকিটা সাগরে ছুটে যায়, আরো বিপুল আরো অবাধ
বন্যার সাথে মিলে তীরের বদলে ভেঙে পড়ে উপকূলে।
তারপর তার আদেশে সমতল ছড়ায়, অবতল নামে,
পাথুরে পাহাড় জেগে উঠে, অরণ্য পরে সবুজ কাপড়।
আর আকাশ যেমন ডানে দুই বামে দুই ভাগে বিভক্ত
আর মাঝখানে পঞ্চম অঞ্চল সবার চেয়ে তপ্ত,
তেমনি পরিবৃত পৃথিবীর তল পাঁচ ভাগে ভাগ হয়
স্রষ্টার ইচ্ছায়—ভূত্বকে সমান সংখ্যক রেখা আঁকা।
কেন্দ্রের এলাকায় থাকা যায় না বেশি গরমের কারণে,
দুই মেরুতে তুষার, বাকি দুই ভাগ তিনি মাঝখানে রেখে
নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু দেন তাপের সাথে শীত মিশিয়ে।
এদের উপর চাপিয়েছিলেন বায়ুপথ, যা অগ্নিময়
ইথারের চেয়ে তত ভারী পানির চাইতে মাটি যত ভারী।
সেখানেই তিনি জড়ো করেন মেঘ, জমা করেন কুহেলিকা,
মানুষের অন্তর থরথর কাঁপাতে লেলিয়ে দেন বজ্র,
আর বজ্র থেকে বিদ্যুৎ খসাতে লাগিয়ে দেন বাতাস।
বিশ্বকর্মা আকাশের সবখানে সব বায়ুকে ঘুরার
অনুমতি দেন নাই, এদেরকে এখনও ঠেকানো যায় না
যখন একেক এলাকায় রাজত্ব করা একেক বাতাস
বিশ্ব প্রায় ধ্বংস করে দেয়, ভায়ে ভায়ে এমন বিবাদ।
ইউরাস গিয়েছিল পূর্বে উষার দেশে, যেখানে ইরানি
ও আরব পাহাড়ের চূড়ায় রশ্মি হানে ভোরের সূর্য;
সূর্যাস্তের আলো যে সকল উপকূল আলোকিত করে
সেই পশ্চিমে জেফারের রাজ্য; স্কিথিয়া আর উত্তর
মেরু অধিকার করে বোরিয়াস; তার বিপরীতে দক্ষিণে
অবিরাম কুয়াশা ও বৃষ্টিতে ভেজা দেশে থাকে অস্টার।
এই চার বাতাসের উপরে তিনি বসিয়েছিলেন ইথার,
ওজনহীন তরল, যার মাঝে কোনো পার্থিব কণা নাই।

এভাবে নির্দিষ্ট সীমানায় সব বাঁধতে না বাঁধতেই
এতকাল অন্ধকারের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সব
তারা সারা মহাকাশ জুড়ে আগুনের মতো জ্বলা শুরু করে।
আর প্রতিটি অঞ্চলকে যার যার যোগ্য জীবন দিতে
দেবতাদের রূপ ও তারামণ্ডল বাসা বাঁধে মহাকাশে,
ঝকঝকানো মাছের জন্য জায়গা করে দেয় সমুদ্র,
মাটি পায় পশুদের, আর অবাধ বাতাস হয় পাখিদের।
এদের চেয়ে পবিত্র, মনের দিক দিয়ে আরো মহীয়ান
কোনো প্রাণী ছিল না যে বাকি সবাইকে শাসন করতে পারে।
তখন মানুষ হলো—হয় নিজের দৈব বীজ থেকে তাকে
বানিয়েছিলেন আরো ভালো এই বিশ্বের বিধানকর্তা,
অথবা এই মাত্র ইথার থেকে আলাদা হওয়া মৃদু মাটি
(যার তখনো আত্মীয়তা রয়ে গেছে মহাশূন্যের সাথে)
হাতে নিয়ে তার সাথে পানি মিশিয়ে ইয়াপিটাসের পুত্র
বানিয়েছিলেন সর্বনিয়ন্ত্রক দেবতাদের আদল।
যেখানে অন্য সব প্রাণী মাথা ঝুলিয়ে রাখে মাটির দিকে
সেখানে মানুষকে দিয়েছেন উন্নত শির, যা আকাশে তুলে
চোখ তাক করতে বলেছেন তারাখচিত খিলানের দিকে।
যে মাটি অতীতে ছিল রূপহীন রসহীন তাকে এইভাবে
ঢালাই করে দিয়েছিলেন মানুষের নতুন অচিন রূপ।

স্বর্ণযুগ ছিল প্রথম যুগ, যখন আইন না থাকলেও
মানুষ স্বাধীন ইচ্ছায় নীতি ছাড়া ন্যায়ের পূজা করত।
শাস্তির ভয় ছিল না, মানুষ পড়ত না ব্রঞ্জে খোদাই
করা হুমকির বাণী, বিচারকের সামনে হাঁটু গাড়ত না
শঙ্কিত অপরাধী, জজ ছাড়াই সবাই ছিল নিরাপদ।
পাহাড়ের ভরা গাল থেকে কেটে নিয়ে কোনো পাইন গাছ
বিদেশের উদ্দেশে ভাসানো হয়নি সাগরের তরঙ্গে,
মানুষ তার নিজের কূল ছাড়া আর কোনো তীর চিনত না।
গভীর পরিখা দিয়ে ঘেরাও করা হয়নি কোনো শহর,
ছিল না পিতলের সরল তুর্য, ছিল না বক্র শিঙা,
ছিল না শিরস্ত্রাণ, ছিল না কৃপাণ, সৈনিক লাগত না,
যুদ্ধ ছিল না বলে সব দেশ ছিল নিরাপদ অবসরে।
মাটিতে মই চলত না, লাঙল তাকে ধর্ষণ করেনি,
পৃথিবী স্বেচ্ছায় নিজের মাধ্যমে ক্ষুধা মিটাত সবার;
বিনা চেষ্টায় পাওয়া খাবারে সন্তুষ্ট মানুষ তখন
পাড়ত আর্বুটাস গাছ থেকে ফল, বুনো পাহাড়ি স্ট্রবেরি,
তুলত কাঁটা গাছের ঝোপে লেপটিয়ে থাকা দুর্লভ চেরি,
কুড়াত জুপিটারের ঝাঁকড়া ওক গাছ থেকে পড়া একর্ন।
অনন্ত ছিল বসন্ত, নরম জেফারের গরম শ্বাস
মাটি থেকে কোনো বীজ ছাড়া জন্মানো ফুলে আদর বুলাত।
কুমারী পৃথিবীর পেটে আবার এসেছিল শ্যামল শস্য,
গমের শিষের ভারে অনাবাদি মাঠক্ষেত হয়েছিল সাদা;
এখানে বয় দুধের নদী, ওখানে ফুল থেকে মধুর ধারা,
সবুজ ওকের ত্বক থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে স্বর্ণালি মধু।

যখন স্যাটার্ন তার্তারসের অন্ধকারে বন্দি হন
জগৎ আসে জোভের অধীনে, শুরু হয় রুপার প্রজন্ম,
সোনার চেয়ে অনেক খারাপ কিন্তু ব্রঞ্জের চেয়ে দামী।
জুপিটার সনাতন বসন্তকে সংকুচিত করে আরো
তিনটা ঋতু বানান, শীত গ্রীষ্ম আর খেয়ালি হেমন্ত,
ছোট বসন্ত নিয়ে তখন এক বছরে হয় চার ঋতু।
তখন প্রথম গরমে ঝলসানো বাতাস জ্বলজ্বল করে
ভয়ানক তাপে, আর শীতল বাতাসে ঝুলে হিমেল বরফ।
তখন প্রথম বাড়ি বানানো হয়েছিল (বাড়ি ছিল গুহায়
বা ঘন ঝোপঝাড়ে বাকল দিয়ে কোনমতে বাঁধা ডালপালা)।
তখনি বোনা হয় ফসলের বীজ ক্ষেতের দীর্ঘ সীতায়
সিরিসের বরে, আর কাঁধে জোয়ালের ভারে গোঙায় বলদ।
অতঃপর ব্রঞ্জের বংশ নিয়ে এসেছিল তৃতীয় যুগ,
মানুষ আরো হিংস্র ছিল, গড়েছিল ভয়ংকর অস্ত্র,
কিন্তু পাপী ছিল না। সব শেষে এলো কঠিন লোহার যুগ।

আরো অধম ধাতুর এই কলিযুগে সব ধরনের পাপ
জগতে ছড়িয়ে পড়ে; পালায় সত্য বিনয় ও বিশ্বাস,
তাদের খালি জায়গা দখল করে মিথ্যা আর কপটতা,
প্রতারণা, ক্ষমতার জোর, সম্পদের লোভে সহিংসতা।
জাহাজের পাল উঠে (নাবিক তখনো ভালো চালাতে জানে না),
যেই সব পাইন গাছ আগে পাহাড়ের চূড়া ঘিরে রেখেছিল
তারা জাহাজের তলি হয়ে আছড়ে পড়ে তরঙ্গের বুকে,
যে ভূমি আগে সবার সাধারণ সম্পদ ছিল আলো আর
বাতাসের মতো তার বুকে আমিন আঁকেন সীমান্তরেখা।
বিপুলা বসুধা যে খাবার ও ফসল দিত মানুষ তাতেও আর
তুষ্ট থাকে না, আরো পাওয়ার লোভে পৃথিবীর গর্ভ খুড়ে
স্টিক্স নদীর বিষণ্ণ ছায়ায় অনেক দিন ধরে লুকানো
সব সম্পদ বের করে এনে অমঙ্গল উস্কে দেয়।
লোহা ক্ষতিকর, কিন্তু আরো মারাত্মক সোনাও তখন
খনন করা হয়, শুরু হয় যুদ্ধ যাতে দুইটাই লাগে,
এই বার মানুষের রক্তাক্ত হাতে কাঁপে মারণাস্ত্র।
তারা লুট করে খায়: রক্ষা পায় না হোস্টের থেকে গেস্ট,
জামাই থেকে শ্বশুড়, ভায়ে ভায়ে সদ্ভাব দেখাই যায় না।
বরের মরণ চায় বউ, আর বউ চায় মরুক জামাই,
খুনের নেশায় সৎ মা পেয়ালায় মিশায় বীভৎস বিষ,
জ্যোতিষীর কাছে যায় পুত্র পিতার মৃত্যুদিন জানতে।
মর্তে ধার্মিকতা হার মানে, রক্তভেজা এই মাটির
শেষ অমর্ত্য কুমারী আস্ত্রিয়াও আতঙ্কে চলে যান।

পৃথিবীর চেয়ে নিরাপদ ছিল না তখন ইথারের দেশ,
লোকে বলে দানবের দল স্বর্গের ছাদ ছোঁয়ার জন্য
পাহাড়ের উপরে পাহাড় উঠিয়েছিল তারা পর্যন্ত।
সর্বশক্তিমান পিতা অবশেষে অলিম্পাসে হানেন
তার বজ্র, ওসার উপর থেকে আছড়ে পড়ে পিলিয়ন।
এক দানবের তলে পিষ্ট হয় আরেক দানবের লাশ,
মা পৃথিবী তার সন্তানের গরম রক্তে গোসল করে,
শোনা যায়, সেই রক্তকেই দিয়েছিলেন নতুন জীবন,
এবং তার আগের বংশের স্মৃতি একেবারে মুছে দিতে
এদেরকে দেন মানুষের রূপ। কিন্তু নতুনরাও ঘৃণা
করত দেবতাদের, আগের মতোই নিষ্ঠুর ও হিংস্র
তারা ছিল জিঘাংসু: বুঝাই যেত যে রক্তের সন্তান।
স্যাটার্নের পুত্র দেবপতি উঁচু কেল্লা থেকে তা দেখে
আর্তনাদ করেন, তার মনে পড়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া
লোকের অজানা এক ঘটনা: লিকায়নের বীভৎস ভোজ;
মনে পড়ায় জোভের যোগ্য ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তিনি
দেবতাদের মিটিং ডাকেন: আসতেও দেরি করেনি কেউ।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে রাতে স্পষ্ট দেখা যায় এক
দুধের নদী, শাদা জ্যোতির জন্য বিখ্যাত মিল্কিওয়ে।
এই পথ ধরেই দেবতারা সব সময় আসেন বজ্র-
ধরের রাজবাড়িতে। এই সড়কের ডানে ও বামে আর্য
দেবতাদের প্রাসাদে বিশাল দরজা খোলা, অতিথির ভিড়,
(অনার্য দেবতারা অন্যত্র থাকে) সবচেয়ে শক্তিমান
ও মহান দেবদেবী এইখানে যার যার বাড়ি করেছেন।
সাহসের সাথে যা ইচ্ছা তা বলতে পারলে এই পাড়াকে
স্বর্গের প্যালাটাইন বলতে একটুও দ্বিধা করতাম না।
সুতরাং যখন মার্বেলের দরবারে সব দেবতা বসেন,
আর জিউস সবার উপরে তার আইভরির সেপ্টারে
ভর দিয়ে ভয়াবহ ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকান তিন চার বার,
সে ঝাঁকিতে পৃথিবী সমুদ্র নক্ষত্র সব কেঁপে উঠে।
তখন তার ক্রুদ্ধ ঠোঁট থেকে বের হয়েছিল এই কথা:

‘আগে কখনো আমার মহাবিশ্বের জন্য দুশ্চিন্তা
হয়নি এত, এমনকি যখন দানবেরা সাপের মতো পা
ফেলে একশ হাতে আকাশ আঁকড়াতে চাচ্ছিল তখনো না।
সেই শত্রু অনেক ভয়ানক ছিল নিঃসন্দেহে, তবে
অন্তত জানতাম সব এটাক আসছে একখান থেকে।
এখন এ পৃথিবীর যতখানে নিরিয়াসের নাদ শোনা যায়
সবখানে মানুষকে ধ্বংস করতে হবে: আমি প্রতিজ্ঞা
করছি পাতালে স্টিক্সের বাগান ধোয়া সব নদীর নামে!
রোগের নিরাময়ের জন্য সব চেষ্টা করেছি, সারেনি,
এখন চালাতে হবে ছুরি, যাতে না ছড়ায় সুস্থ অংশে।
ভাবতে হবে দেবযোনি গ্রামদেবতা আর পরীদের কথা,
বনের ফন স্যাটার আর পর্বতবাসী প্রেতদের কথা:
আমরা এদের আসমানে থাকার যোগ্য মনে করি নাই,
তাই অন্তত জমিনকে ভূতের বাসযোগ্য রাখা চাই।
তোমাদের মনে হয়, আমার দেবতারা, যে তারা নিরাপদ
থাকবে যেখানে বিদ্যুতের বিধাতা, দোজাহানের মালিক
এই আমাকে ফাঁদে ফেলার প্ল্যান করে জানোয়ার লিকায়ন?’
কম্পিত সব দেব গর্জন করে উঠে এ বেইমানির
উচিত শাস্তি দাবী করে। দেশদ্রোহীর দল সিজারের
রক্ত ঝরিয়ে যেদিন রোমের নাম মুছে দিতে চেয়েছিল
পরম ধ্বংসের ভয়ানক আশঙ্কায় স্তম্ভিত এই
মর্তের সব মানুষ সেদিন ঠিক এভাবেই কেঁপেছিল।
এবং প্রজার পূজা তোমাকে, অগাস্টাস, যে তুষ্টি দেয়
জোভও তেমন তুষ্ট হয়েছিলেন। মুখের কথায় তিনি
সব স্তব্ধ করেন, হাত ইশারায় সব শান্ত করেন।
তার গ্র্যাভিটির ভারে যখন সম্মেলনে মৌনতা নামে,
তখন মহান জুপিটার নিজে আবার নীরবতা ভাঙেন:
‘তার উচিত শাস্তি হয়ে গেছে, চিন্তার কিছু নাই আর।
কিন্তু তোমাদেরকে বলছি কি ছিল অপরাধ, কি শাস্তি।
এ যুগের সব কলুষের কথা আমাদের কানে এসেছিল;
তবে তা ভুল প্রমাণ করতে অলিম্পাস থেকে নেমে আমি
দেবতা হয়েও মানুষের বেশে হেঁটে ঘুরি পৃথিবীর পথে।
সবখানে কত পাপ দেখেছিলাম বলার সময় হবে না,
যা শুনেছিলাম বাস্তবতা তার থেকেও অনেক খারাপ।
পার হয়ে যাই মাইনালা যেখানে অনেক পশুর নিবাস,
কিল্লিনি পার হই, লিকেয়ন পর্বতে দেখি পাইন বন;
সেইখান থেকে আর্কেডিয়ার স্বৈরাচারের রাজপুরে,
অতিথির প্রতিকূল তার প্রাসাদে যাই নিশা যখন নামে।
সংকেতে বুঝিয়েছিলাম আমি দেবতা, লোকজন পূজা
দিতে শুরু করেছিল, লিকায়ন তাদেরকে মশকরা করে,
তারপর বলে: দেবতার পরীক্ষা হয়ে যাক, দেখি এর
মৃত্যু আছে কি নাই, যাতে সত্য নিয়ে না থাকে সন্দেহ।
‘তার জল্পনা ছিল রাতে ঘুমের সময় পুরা অচেতন
আমাকে খুন করবে, এই তার সত্যে পৌঁছানোর পথ।
তবে কেবল তাতেই সন্তুষ্ট ছিল না, মলোসাস থেকে
পাঠানো এক দাসের গলা কাটে তার ধারালো ছুরিটা দিয়ে,
তারপর তার দেহ টুকরা টুকরা করে কয়েক টুকরা
পানিতে সিদ্ধ করে, আর কয়েক টুকরা আগুনে পুড়ায়।
এই মাংস টেবিলে দিতেই আমার হিংস্র বজ্র হেনে
তার বাড়ি উপড়িয়ে ফেলি তার গৃহদেবতাদের উপর।
সে ভয়ে পালায়, ঠাঁই খুঁজে মাঠের নিরাপদ নীরবতায়,
গর্জন করে মুখে শব্দ আনতে চায়, মুখের কোণায়
ফেনা জমে উঠে, ঘন আক্রোশে তার সব জিঘাংসা হানে
পশুপালের উপর, এখনো রক্তেই সে আনন্দ পায়।
তার কাপড় বদলে হয় রুক্ষ পশম, হাত বদলে পা,
সে হয়ে যায় নেকড়ে, তবে মানুষের চিহ্ন তখনো ছিল:
আগের মতোই তার চুল সাদা, চেহারায় সেই হিংস্রতা,
শীতল চোখে জ্বলছে আগুন, সেই বর্বরতার মূর্তি।
ধ্বস্ত হয়েছে একটা বাড়ি। আরো অনেক বাড়ির পাওনা
হয়ে গেছে ধ্বংস; সারা দুনিয়ায় ফিউরিদের রাজত্ব।
যেন মানুষ গুনাকে ফরজ মানে। যার যা পাওনা তাকে তা
পেতেই হবে, শাস্তি অবধারিত, আমার এই শেষ কথা।’
শুনে কোনো কোনো দেবতা সরবে জিউসের আক্রোশে আরো
ইন্ধন যোগ করে, কেউ কেউ নীরবে সমর্থন দেয়।
কিন্তু মানুষের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ভেবে মন
খারাপ হয় সবার, পৃথিবীর মানুষ ছাড়া ভবিষ্যৎ
কি হবে চিন্তা হয়, ধূপ আর দীপ নিয়ে তাদের বেদিতে
কে আসবে, পৃথিবী কি লুটেরা পশুর হাতে ছেড়ে দেয়া হবে?
সবার শঙ্কা বুঝে তাদেরকে আশ্বস্ত করেন পিতা,
বলেন যে তিনি সব দেখবেন, আর নতুন এমন এক
প্রজাতি প্রমিজ করেন যাদের জন্ম হবে অলৌকিক।
এবং বজ্রে তিনি পুরা পৃথিবী পুড়াতে উদ্যত হন,
কিন্তু শঙ্কা হয়, না জানি আগুন লেগে যায় ইথারেও
আর পৃথিবীর সাথে পুড়তে শুরু করে পুরা মহাশূন্য,
মনে পড়ে নিয়তির সে প্রেডিকশন: আসবে এমন দিন
যখন ঐ সাগর, ঐ ভূমি, এই আকাশের সব দেশ,
এত শৈল্পিক মহাবিশ্ব—সব পুড়ে হবে নিশ্চিহ্ন।
ভেবে তিনি সাইক্লপ্সের হাতে গড়া বাজ সরিয়ে রাখেন;
ভাবেন অন্য শাস্তির কথা, মানুষকে পানিতে ডুবিয়ে
মারবেন আকাশের সব মেঘ থেকে ঘন বৃষ্টি ঝরিয়ে।
সাথেসাথে উত্তর বায়ুকে আয়োলাসের গুহায় বাঁধেন,
মেঘ তাড়ায় এমন আর সব বাতাস বন্দী করে শুধু
নোটাসকে ছেড়ে দেন। ভেজা ডানায় দখিন বায়ু উড়ে যায়,
তার ভয়ংকর চেহারা ঢাকা পিচের মতো অন্ধকারে,
বৃষ্টির ভারে ভারী তার দাড়ি, চুল বেয়ে পড়ে ঘন পানি,
কপালে জমেছে বিষাদের মেঘ, পানি হয়ে বইছে পোশাক।
যখন সে নীচু কালো সব মেঘ চওড়া দু হাতে চেপে ধরে,
ক্র্যাশের শব্দ হয়; আকাশ ভেঙে পড়ে অঝর বর্ষণ।
এবং সাত রঙের কাপড় পরে জুনোর দূত আইরিস
রংধনু পথে পানি আকাশে তুলে সতেজ রাখে মেঘদের।
কৃষকের আশা হয়ে ফুটে উঠা পাকা শস্য সব নষ্ট
হয়ে যায় তার সারা বছরের শ্রম নিষ্ফল করে দিয়ে।
জোভের আকাশে তার ক্রোধ নিবারণের মতন পানি নাই,
তাই তার নীল ভাই সাগরের পানি নিয়ে সহায় হলেন।
নৃশংস নেপচুন সব নদীকে আদেশ করেন আসতে
তার প্রাসাদে, আসলে শুধু বলেন, ‘সময় নাই ভাষণের,
যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়, এই শুধু দরকার,
খুলে দাও সব দ্বার, যার যত আলি বাঁধ আছে ভেঙে দাও,
সকলের সব নদী ছুটে যাক নির্বাধ আমার সাগরে!’
এই ছিল নির্দেশ; নদীরা বাড়িতে ফিরে সব ঝরনার
মুখ খুলে দেয়, সবাই মুক্তি পেয়ে ধেয়ে যায় সমুদ্রে।
সাগরের রাজা তার ত্রিশূল দিয়ে মাটিকে আঘাত করেন
আর ভূমি মহাতঙ্কে খুলে দেয় আরো হাজার পানিপথ।
অববাহিকার খোলা প্রান্তর পেয়ে সব পথে পানি ধায়
সাথে নিয়ে ফিগ গাছ, পশুদের পাল আর এদের রাখাল,
তাদের সাধের বাড়ি—ডুবে যায় গৃহদেবতার মন্দির।
কোনো বাড়ি যদি টিকেও থাকে দৈব দুর্যোগ রোধ করে,
বিধ্বস্ত না হয়, তবুও ডুবে যায় তরঙ্গের তলে,
তার সবচেয়ে উঁচু চূড়াটাও ঠাঁই খুঁজে পানির তলায়।
এবং এখন স্থল আর জলে আর কোনো ব্যবধান নাই,
সবকিছুই সাগর, সব খানে সমুদ্র সৈকতহীন।
পাহাড়ে উঠে বাঁচতে চায় কেউ, কেউ কেউ নৌকায় উঠে
সেখানে চালায় বৈঠা যেখানে একদিন চালাত লাঙল,
কেউ নিজের ক্ষেতের উপর কেউ নিজের বাড়ির উপর
দিয়ে পাল তুলে যায়, কেউ এল্মের শাখায় ধরছিল মাছ।
নৌকার নোঙ্গর মাঠের সবুজ ঘাসে আঁচড় কাটে, বা
জাহাজের বাঁকা তলি বয়ে যায় কোনো আঙুরের ক্ষেত ছুঁয়ে।
একদিন যে-মাঠে ঘুরে ঘুরে ঘাস খেত সুকুমার ছাগল
এখন সেখানে পড়ে আছে সিল মাছের কদাকার শরীর।
জলের তলে নগর বাগান ও ঘরবাড়ি দেখে বিস্মিত
নেরিয়াসের মেয়েরা, ওদিকে বন দখল করে ডলফিন
খেলার ছলে ধাক্কা দিয়ে জোরে ঝাঁকায় ওকের ডালপালা।
নেকড়ে সাঁতরায় ভেড়ার সঙ্গে, সিংহ ভাসে তরঙ্গে,
তরঙ্গে ভাসে বাঘ, ভালুকের বিজলির মত বল নিষ্ফল,
পানিতে আর কাজে লাগে না হরিণের পা, ভাসে, শুধুই ভাসে।
পাখিরা অনেক দিন খুঁজছিল জিরানোর একটু জায়গা,
না পেয়ে এক সময় অবশ ডানায় হুমড়ে পড়ে সাগরে।
সব বাধ টুটে গেলে সাগর সব পাহাড় ঢেকে দিয়েছিল,
পাহাড় চূড়ায় ভেঙে ভেঙে পড়ছিল অভূতপূর্ব ঢেউ।
অধিকাংশ মানুষ মরেছিল জলে ডুবে, যারা বেঁচে ছিল
তাদের মৃত্যু হয় ধীরে ধীরে ধুঁকে ধুঁকে ক্ষুধা তৃষ্ণায়।

বিওতিয়া থেকে ওতিয়ার ক্ষেত আলাদা করে ফোসিস
যা মাটি থাকতে বেশ উর্বর ছিল, এখন সমুদ্রের
অংশ কেবল; কত বড় প্রদেশ কত দ্রুত তলিয়ে গেল!
সেখানে পার্নেসাস নামের এক পাহাড় মেঘ ভেদ করে
তার দুই উঁচু খাড়া শিখর তুলে ধরেছে তারাদের দিকে।
ডিউকেলিয়ন এখানে (কারণ আর সব পানি দিয়ে ঢাকা)
ভিড়েছিল ছোটো এক ভেলায় তার বউ পিরাকে সাথে নিয়ে;
নেমেই পূজা করে করিকিয়ান পরী ও পাহাড়ি দেবদের,
আর ওরাকলের মুখে ভবিষ্যৎ বলা দেবী থিমিসের।
তার চেয়ে ভালো আর ন্যায়পরায়ণ কোনো পুরুষ ছিল না,
তার বউয়ের চেয়ে দেবতাভক্ত কোনো নারীও ছিল না।
জুপিটার দেখলেন সারা পৃথিবী বদ্ধ জলাশয়ে ঢাকা,
শুধু এক জন পুরুষ বেঁচে আছে হাজার পুরুষের মাঝে
আর শুধু এক জন নারী বেঁচে আছে হাজার নারীর মাঝে,
দুজনেই নিষ্পাপ, দুজনেই দেবতার ভীরু উপাসক,
দেখে তিনি সব মেঘ ছিঁড়ে তাড়ালেন উত্তর বায়ু দিয়ে
এবং দেখালেন পৃথিবীকে আকাশ ও আকাশকে পৃথিবী।
সমুদ্রের ক্রোধও আর ছিল না, তীক্ষ্ণ ত্রিশূল নামিয়ে
রেখে সাগরের রাজা তার পানিবাহিনীকে শান্ত করেন,
এবং ডাকেন সাগরের মতো নীল দেবতা ট্রাইটনকে,
যে গভীর থেকে দুই কাঁধে ঝিনুকের ঝাঁক নিয়ে উঠে আসে;
তাকে বলেন শঙ্খ বাজিয়ে সব ঊর্মি ও নদীকে ফিরে
যাওয়ার হুকুম দিতে। সে তুলে ধরে তার ফাঁপা শাঁখের তুরি,
যা নিচ থেকে উপরে ঘূর্ণির মতো ঘুরে ঘুরে ব্যাসে বাড়ে,
যাতে মাঝ সমুদ্র থেকে ফুৎকার দিলে সূর্যদেবতা
এপোলোর পথ পূব থেকে পশ্চিম তক ঝংকৃত হয়।
যখন এই শঙ্খ তরল দাড়িতে ভেজা ঠোঁটে চেপে ধরে
দেবতা আদেশমতো ফুঁক দিয়ে সবাইকে ফিরে যেতে বলে,
ভূমি ও সমুদ্রের সবখানে সব পানি তা শুনতে পায়
এবং যার কানেই যায় সে-ই তার প্রবাহ দমন করে।
এখন সমুদ্রের আছে তীর, উতলা নদীর দুই পার,
বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আবার জেগে উঠে পর্বত,
সাথে জাগে সমতল ভূমি, পানি যত নামে মাটি তত উঠে,
অনেক দিনের পরে আবার নগ্ন হয় বনের চাঁদোয়া,
তখনো গাছের পাতা দেখা যায় মেখে আছে বন্যার কাদা।
বিশ্ব মুক্তি পেয়েছিল। তবে ডিউকেলিয়ন যখন দেখল
জনমানবশূন্য সারা জগৎ জুড়ে নিবিড় নীরবতা
তখন চোখের জলে ভেসে পিরার দিকে তাকিয়ে বলেছিল:
‘আমার বোন, আমার বউ, মৃত্তিকার একমাত্র মেয়ে,
পরিবার বংশ ও বাসরের বিছানা আমাদেরকে আগে
একত্র করছিল, এখন এক করছে এই দুর্যোগ,
পৃথিবীর সানসেট থেকে সানরাইজ পর্যন্ত মাটিতে
শুধু আমরা দুজন আছি, বাকিদেরকে সাগর নিয়ে গেছে।
তার উপর এখনো এইখানে আমাদের জীবনের দাবী
অনিশ্চিত, এখনো ভয় লাগতেছে ঐ সব মেঘ দেখে।
যদি ভাগ্য আমাকে ছাড়া উদ্ধার করত শুধু তোমাকে,
কেমন লাগত রে অভাগী? এমন আতঙ্ক এত একা
কেমনে সহ্য করতা? কে তোমার দুঃখে সান্ত্বনা দিত?
কারণ (বিশ্বাস করো) সমুদ্র তোমারে যদি কেড়ে নিত,
আমিও ঝাঁপ দিতাম, সোনাবউ, সাগর আমারেও পাইত।
আহ, যদি পৈতৃক ক্ষমতায় মাটির মধ্যে প্রাণ ফুঁকে দিতে
পারতাম তাইলে মানবজাতি আবার ফিরায়ে আনতাম!
এখন মানবতা শুধু আমাদের উপর নির্ভরশীল,
(উপরের খায়েশে) মানুষের একমাত্র মডেল আমরা।’
সে বলে, তারা কান্দে। তারপর তারা ঠিক করে আকাশের
দেবদের কাছে দোয়া করবে, ওরাকলের সাহায্য চাবে।
এবং তখনি পাশাপাশি হেঁটে যায় সেফিসাসের নদীতে
যার পানি স্বচ্ছ না হলেও যাচ্ছে আগের চ্যানেল ধরে।
নদী থেকে পানি নিয়ে তারা তাদের জামাকাপড় ও মাথায়
ছিটিয়ে তর্পণ করেছিল, তারপর আগায় থিমিসের
পুণ্য মন্দিরের দিকে, কাছে গিয়ে দেখে তার চাঁদোয়ারি
শেওলার কারণে বিবর্ণ, বেদিতেও কোনো আগুন নাই।
মন্দিরের সিঁড়িতে আসতেই তারা দুই জন শ্রদ্ধায়
সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ভয়ার্ত ঠোঁটে শীতল পাথরে
চুমু খায়, তারপর বলে, ‘ন্যায়বানের প্রার্থনায় যদি
দেবতাদের মন গলে, তাদের ক্রোধ যদি প্রশমিত হয়,
তাহলে, থিমিস, বলো আমরা কিভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞ
মেরামত করব; আমাদের সহায় হও, হে দয়াল দেবী।’
দেবী করুণায় গলে এই ওরাকল দেন: ‘মন্দির ছেড়ে
যাও মাথায় কাপড় দিয়ে আর ঢিলা করে গায়ের পোশাক,
যাওয়ার সময় ছুঁড়ো পিছনে তোমাদের মহামাতার হাড়!’

তারা অনেকক্ষণ ছিল বিহ্বল, পিরা আগে মৌনতা ভেঙে
জানায় দেবীর এই আদেশ সে পারবে না পালন করতে,
কম্পিত ঠোঁটে ক্ষমা চায় সে, কারণ তার মনে হচ্ছিল
হাড় ছুঁড়লে মায়ের আত্মা নিঃসন্দেহে কষ্ট পাবে।
তখন ওরাকলের রহস্যময় কথা আরো ভাবে তারা,
প্রতিটা শব্দের লুকানো অর্থ উল্টে পাল্টে দেখে।
প্রমিথিউসের ছেলে অবশেষে এপিমিথিউসের মেয়েকে
সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘আমার চিন্তা যদি ঠিক হয়ে থাকে,
পবিত্র ওরাকল কখনো দিতে পারে না অশুভ আদেশ,
সুতরাং মহামাতা স্বয়ং পৃথিবী আর তার হাড় হলো
পৃথিবীর শরীরের পাথর, যা বলছেন পিছনে ছুঁড়তে।’
স্বামীর এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়েছিল টাইটানিয়া,
তবে নিজের আশায় অত আস্থা ছিল না, তারা স্বর্গের
বাণী বেশ সন্দেহ করত, তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?
পাহাড় থেকে নামার সময় কাপড় ঢিলা করে মাথা ঢেকে
তারা পিছনে পাথর ছুঁড়তে থাকে দেবীর উপদেশমতো।
আর সে পাথর (শ্রুতির সাক্ষ্য ছাড়া কে বিশ্বাস করত?)
পড়তে না পড়তেই তাদের কঠিনতা কঠোরতা হারিয়ে
নরম কোমল হতে থাকে, আর পেতে শুরু করে আকৃতি।
আকারে বাড়ার পর তাদের প্রকৃতি আরো সদয় হয়,
দেখতে কিছুটা অসমাপ্ত মানুষের মতো লাগে, এখনো
অনেক অস্পষ্ট—মার্বেলে মানুষের মূর্তি খোদাই
শুরু করলে যেমন প্রথমে আবছা এক রূপ উঁকি দেয়।
পাথরের যে অংশ আর্দ্রতা থাকায় মাটির মতো মৃদু
ও সোঁদা তা পরিণত হয়েছিল শরীরের নরম মাংসে,
কঠিন আর অনড় অংশ থেকে হয়েছে ভিতরের হাড়,
আর যার নাম ছিল শিরা পরেও একই থাকে তার নাম;
এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিধাতার ইচ্ছায়
পুরুষের হাতে ছোঁড়া পাথর পায় নতুন পুরুষের রূপ
ও নারীর হাতে ছোঁড়া পাথর পূরণ করে নারীর অভাব।
আমরা যে অনেক কঠিন জাতি, অনেক শ্রম দিতে পারি,
তাই আমাদের এই আদি উৎসের সাক্ষ্য বহন করে।
নানা রূপের অন্য অনেক প্রাণী তৈরি করেছিল মাটি
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যখন বহুদিনের বাঁধা সোঁদা পানি
শুকায় রোদের তাপে; থকথকে কাদা আর ঘন জলাভূমি
তাপে ফুলে উঠেছিল, জীবনের বিভিন্ন বীজ জননীর
গর্ভের মতো সেই মাটিতে পুষ্টি পেয়ে বড় হতে থাকে
এবং সময়ে প্রতিটা বীজ তার নির্দিষ্ট রূপ পায়।
অনেকটা যেমন প্লাবনে ডোবা ক্ষেত থেকে সাত মুখওয়ালা
নীল নদ নেমে তার আদি চ্যানেলে আবার আবদ্ধ হলে
তখনো সিক্ত কাদা সূর্যের আলোতে পুড়ে শুষ্ক হয়,
আর তার পর কৃষক মাটির ঢেলা উল্টাতে গিয়ে পায়
অনেক নতুন প্রাণ, কোনোটা মাত্র শুরু করছে জীবন,
কোনোটা একেবারেই কাঁচা, শরীরের সব অঙ্গ এখনো
ফুটে উঠতে পারেনি; কখনো দেখতে পায় একই দেহের
এক অংশ জীবিত আর আরেক অংশ কাঁচা কাদামাটি।
আর্দ্রতা আর শুষ্কতা একত্রিত হয়েই নির্মাণ করে
সব প্রাণ, এই দুই উপাদান থেকে সবকিছুর জন্ম;
পানি ও আগুন একে অপরের বিপরীত হলেও সৃষ্টি
করে দুই জন মিলে, মিলনের সাথে বিরোধের এত ভাব!

সুতরাং সেই সাম্প্রতিক বন্যার কাদা মাখা পৃথিবী
যখন ইথারচারী সূর্যের তাপী আলোতে উষ্ণ হয়
তখন প্রসব করে অসংখ্য অদ্ভুত প্রজাতি, কোনোটা
আগের মতন, আর কোনোটা একদম নতুন মনস্টার।
তখন অনিচ্ছায় পৃথিবী জন্ম দিয়েছিল তোমাকেও,
পাইথন, অভূতপূর্ব সাপ তুমি কুণ্ডলিতে পাহাড়
পেঁচিয়ে ধরে নতুন প্রজন্মকে করেছিলে আতঙ্কিত।
এ সাপ মেরেছিলেন তিরন্দাজ এপোলো; পূর্বে যে তিরে
তিনি নিরীহ ছাগী ও হরিণী ছাড়া কিচ্ছু বধ করেননি
তা সেবার সাপের দিকে ছুঁড়লেন তূণীর খালি করে,
কালো ক্ষত থেকে সব বিষ উগরে দিয়ে সে নির্মূল হয়।
এবং সময় যাতে এ খুনের সুখ্যাতি মুছতে না পারে
সেজন্য দেবতা নতুন এক প্রতিযোগিতা চালু করেন,
নিহত সাপের নামে যার নাম হয়েছিল পিথিয়ান গেমস।
এই উৎসবে হাত পা বা রথের কসরতে যারা জিততো
তাদের মাথায় ওক পাতার জয়মালা পরিয়ে দেয়া হতো;
লরেল ছিল না বলে তখন দ্যুতির দেবতা নিজেও তার
দিঘল বহতা চুল বেঁধে নিতেন যেকোনো পাতার মালায়।
এপোলো প্রথম প্রেমে পড়েন পেনিয়াসের মেয়ে ড্যাফনির,
কাকতালীয় ভাবে না বরং কিউপিডের নির্মম ক্রোধে।
পাইথন খুন করে গর্বিত ডিলসের দেব একদিন
কিউপিডকে খেলার ছলে ধনুকের ছিলা বাঁকাতে দেখেই
বলেছিলেন, ‘কামুক ছেলে, বড়দের অস্ত্র নিয়ে কি করো?
কেবল আমাদের কাঁধেই শোভা পায় এই সব হাতিয়ার,
আমাদের নিশানায় মরে পশু আর দেবদ্রোহী মানুষ;
এই মাত্র আমার হাজার তিরে বধ করেছি পাইথন,
হাজার একর জুড়ে ছড়িয়ে ছিল যার প্লেগপূর্ণ পেট।
তুমি তোমার ছোট্ট মশালে শুধু প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে
বিন্দাস থাকো, আমাদের গৌরবে ভাগ বসাতে এসো না।’
উত্তরে ভিনাসের ছেলে বলে, ‘তোমার তিরে বিঁধুক সব,
আমারটা বিঁধবে তোমারে, দেবতার থেকে পশুপাখি
যত ছোট, আমার কাছে তোমার গৌরব ততটুক ছোট।’
এই বলে সে বজ্রডানায় উড়ে যায় বাতাস ভেদ করে,
পার্নেসাসের ছায়াময় চূড়ায় এক নিমিখে পৌঁছায়,
নেমে তার তিরভরা তূণীর থেকে বের করেছিল দুইটা
বিপরীত তির: একটাতে প্রেম আসে, অন্যটাতে পালায়।
প্রেমের তির চকচকে, তীক্ষ্ণ মাথাটা সোনা দিয়ে বানানো,
আর যে-তিরে প্রেম পালায় তার ভোঁতা ডগা সীসার তৈরি।
এই তির মদন পেনিয়াসের পরী মেয়েটার দিকে ছুঁড়ে,
আর এপোলোর অস্থিমজ্জা বিদ্ধ করে প্রেমের তিরে।
দেবতা পড়েন প্রেমে, পরী ‘প্রেমিক’ নামও শুনতে পারে না,
কারণ সে ভালোবাসে বনের গহীনে পশু শিকার করতে,
পালিয়ে বেড়াতে পাল্লা দিয়ে কুমারী দেবী ডায়ানার সাথে—
ফিবির মতোই এলোমেলো চুল বাঁধে শুধু একটা ফিতায়।
অনেকেই তার প্রেমে পড়েছে, সে সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছে,
পুরুষের পরোয়া না করে পরী ঘুরে পথহীন অরণ্যে,
হাইমেন প্রেম বা বিয়ে কাকে বলে জানে না, জানতে চায় না।
বাবা প্রায়ই বলত, ‘তোর কাছে আমি একটা জামাই পাই,’
বাবা আরও বলত, ‘তোর কাছে আমি নাতি নাতনি পাই!’
কিন্তু বিয়ের চিন্তাকে সে ক্রাইমের মতো ঘৃণা করত,
এই সব আবদার শুনে লজ্জায় লাল হতো তার গাল,
বাবাকে আদর করে দুই হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলত,
‘আমার লক্ষ্মী বাবা, সারা জীবন আমাকে প্লিজ ভার্জিন
থাকতে দাও, ডায়ানাকে তার বাবা জিউস তো দিয়েছিলেন।’
বাবা তোমার আর্জি শুনেছিলেন, ড্যাফনি, কিন্তু তোমার
চেহারা শোনেনি; তোমার রূপই তোমার রুচির বিরুদ্ধে।
ফিবির ভাই ফিবাস প্রেমে পড়ে পরীকে বিয়ে করতে চান,
চাওয়া থেকে জাগে আশা, নিজের প্রফেসিই দেবতাকে ঠকায়।
ফসল কাটার পরে ক্ষেতের মুড়া যেভাবে দাউদাউ জ্বলে,
বা কোনো জমির বেড়া যেভাবে জ্বলে যখন উদাস পথিক
কাছে আগুন জ্বালায় বা সকালে জ্বলন্ত কাঠ ফেলে যায়,
দেব সেভাবেই জ্বলে উঠেছিলেন; তার হৃদয় ছারখার
হয় পুড়ে, আশা আরো ইন্ধন ঢালে বিফল ভালোবাসায়।
ড্যাফনির ঘাড়ে উস্কখুস্ক চুল দেখে তিনি আনমনে
বলেন, ‘যদি গুছানো হতো সুন্দরভাবে?’ তারকার মতো
উজ্জ্বল তার চোখ দেখেন, মুখের দিকে তাকান, কেবল
দেখায় সাধ মিটে না; প্রশংসা করেন সরু আঙ্গুলের,
দুই হাতের, কোমল কাঁধ পর্যন্ত খোলা দুই বাহুর।
যা ঢাকা তা আরো সুন্দর মনে হয়। পরী তখন পালায়
বাতাসের চেয়ে দ্রুত, ভ্রুক্ষেপ না করে পিছে এপোলোর ডাক:

‘পরী, পায়ে পড়ি, পরী, দাঁড়াও, থামো, আমি তোমার শত্রু না,
দাঁড়াও, পরী! এভাবে পালায় নেকড়ে থেকে ভেড়া, সিংহের
থেকে হরিণ, ইগল থেকে পায়রা তার থরথর পাখায়;
সবাই শত্রু থেকে পালায়, আমি তো চাইছি তোমার প্রেম।
হায়, কি যে করলাম! ভয় হচ্ছে না জানি তুমি পড়ে যাও,
না জানি ঝোপের কাঁটা তোমায় আঁচড় কাটে আমার কারণে।
যে পথে দৌড়াচ্ছ তা অনেক বন্ধুর, পায়ে পড়ি, পরী,
আস্তে, আস্তে যাও, আমিও তোমার পিছে আস্তে আসব।
ভেবে দেখো কে তোমার রূপে মজেছে। পাহাড়ে আমার বাড়ি না,
রুক্ষ রাখাল নই আমি, ভেড়া বা গরুর পাল নিয়ে এই দেশে
আসিনি চড়াতে। তুমি জানো না, বোকা মেয়ে, জানো না একদম
কার থেকে পালাচ্ছ, তাই পালাচ্ছ। শোনো, ডেলফি ক্লারস
ও টেনেডোস রাজ্য আমার, পূজা পাই পাটারা নগরেও,
জিউস আমার বাবা; অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
আমিই প্রকাশ করি; তার থেকে তান আসে আমার আদেশে।
অব্যর্থ আমার নিশানা, কিন্তু আরো নিশ্চিত এক
জনের তির আমার ভাবনাবিহীন বুক বিদ্ধ করেছে।
মেডিসিনের শিল্প আমার উদ্ভাবন, সারা দুনিয়ায়
ভিষক হিসেবে আমি বিখ্যাত, সব ওষুধের গুণ জানি;
দুর্ভাগ্য আমার যে প্রেম সারানোর কোনো ওষুধ নাই;
সবাইকে সারায় আমার বিদ্যা, সারাতে পারে না আমাকে।’
তিনি আরো বলতেন, কিন্তু পেনিয়াসের শঙ্কিত মেয়ে
কথা শেষ করতে না দিয়ে সামনে এগিয়ে যায় আরো দ্রুত,
তখনো দারুণ লাগে তাকে; বাতাস উড়িয়ে নিচ্ছে শরীর,
বঙ্কিম দেহে লেপ্টানো শিথিল পোশাক উড়ছে পিছনে,
হালকা হাওয়ার তোড়ে বইছে দিঘল চুল, পালানোর দৌড়
আরো বাড়িয়েছে তার রূপ। তখন তরুণ দেবতা কোমল
কথা দিয়ে আর সময় নষ্ট করতে চান না, ধেয়ে যান
তরুণীর পিছনে তৎক্ষণাৎ তার প্রণয়ের তাড়নায়।
যেইভাবে ফ্রান্সের শিকারি কুকুর খোলা মাঠে খরগোশ
দেখলে ধায়, শিকার খোঁজে একজন, আরেক জন শরণ;
কুকুর মুহূর্তের জন্য পিছু ছাড়ে না তার শিকারের,
নাগাল পেলে লম্বা মুখ দিয়ে পিছন-পায়ে আঁচড় কাটে;
শঙ্কিত খরগোশ বুঝতে পারে না ধরা পড়ে গেল কি না,
এক হেঁচকায় দাঁত থেকে পা ছাড়িয়ে আরো জোরে দৌড়ায়—
সেভাবেই ছুটছিল তারা, দেবতা আশায়, ভার্জিন ভয়ে।
তবে এপোলোর গতি বেশি কারণ সহায় তার কামদেব;
পলাতকা এক মুহূর্ত থামতে পারে না, তার পায়ে-পায়ে
দৌড়ানো দেবতার ভারী নিশ্বাস পায় ঘাড়ে আর চুলে।
পরীর সব শক্তি শেষ হয়ে যায়, ছুটে চলার ধকলে
শরীর অবশ, মুখটা মলিন, তখন পেনিয়াসের নদী
দেখে বলে, ‘বাঁচাও বাবা, তোমার পানি যদি ঐশিক হয়
তাহলে বদলে দাও এত মন-মাতানো আমার এই রূপ!’
প্রার্থনা শেষ হতেই নিম্ফের সর্বাঙ্গে আসে এক আড়ষ্টতা;
বুকের কোমল ত্বক ঢেকে দেয় বাকলের পাতলা লেয়ার,
চুল হয় গাছের পাতা, ডালপালা গজায় দুই বাহু থেকে,
ক্ষিপ্র দুই পা থামে মন্থর শিকড়ের টানে, মাথা হয়
গাছের শিখর, কিছুই থাকে না তার উষ্ণ আভাটা ছাড়া।
দেবতা এখনো ভালোবেসে ডান হাত রাখে গাছের গুঁড়িতে,
নতুন চামড়ার নিচে হার্টের বিট এখনো টের পায়,
হাত ভেবে ডালপালা আদরে জড়িয়ে ধরে, বাকলে দুঠোঁট
চেপে চুমু খায়, এখনো কুঁকড়ে উঠে গাছ ঘৃণা করে চুমু।
দেবতা বলেন, ‘তুমি যেহেতু আমার বউ হতে পারবে না,
অন্তত গাছ হও আমার, ওগো আমার লরেল, তোমাকে
পরবে আমার চুল, বাঁধবে আমার বীণা, আমার তূণীর;
তুমি থাকবে রোমান জেনারেলদের সাথে, যখন যাবেন
তারা জনতার জয়গানে মুখরিত পথ দিয়ে ক্যাপিটলে;
তুমি রক্ষা করবে নিষ্ঠার সাথে অগাস্টাসের দ্বার,
মধ্যে তার ওকের মুকুট পাহারা দেবে দুই পাশ থেকে;
যেমন আমার চিরতরুণ চুলে পড়ে না নাপিতের হাত,
তেমন তোমার চিরসবুজ পাতায় থাকবে খ্যাতির দ্যুতি।’
দেবতার বন্দনা শেষ হলে লরেল গাছ তার নতুন
শাখা নেড়ে শিখর নত করে যেন জানিয়েছিল সম্মতি।
এক বন ছিল হিমনিয়াতে, চারদিকে ঘন গাছপালায়
ঢাকা চড়াই, টেম্পি তার নাম। সেখানে পেনিয়াস নদীর
সফেন ঝরনা পিন্ডাস পর্বতমালা থেকে নেমে আসে,
ঢালু গিরিখাতে পড়া জলপ্রপাত থেকে বাষ্পের ধোঁয়া
উঠে মেঘের মতন, পানির ছিটায় ভিজে বনের বিতান,
পানি পড়ার শব্দে কান ফাটে কাছে দূরে সব পড়শির।
এখানেই অন্দরমহল বসতি রাজদরবার সেই
মহানদীর, এখানে পাহাড়ের কোটরে কাটা এক গুহায়
বিচার করছিলেন পেনিয়াস তার পানি আর পরীদের।
সবার প্রথমে তার নিজের দেশের সব নদী এসেছিল,
বুঝতে পারছিল না তাকে সান্ত্বনা দিবে না অভিনন্দন,
ছিল পপলার-ঘেরা স্পার্চিয়াস, অস্থির এনিপিয়াস,
প্রাচীন এপিডেনাস, নরম এমফ্রিসাস এবং এয়াস;
পরে এসেছিল আর সব নদী, যারা আঁকাবাঁকা বিভিন্ন
পথে অনেক ঘুরে তাদের ক্লান্ত পানি নিয়ে যায় সাগরে।

ছিলেন না শুধু ইনাকাস, গুহার গহীনে বসে তার নদী
আরো ভরছিলেন চোখের পানি দিয়ে, কারণ তার কন্যা
আয়ো হারিয়ে গেছে। সে তখনো জীবিত আছে না ছায়ার দেশে
মিলিয়ে গেছে তা জানতেন না; কোথাও তাকে খুঁজে না পাওয়ায়
ভাবেন কোথাও নেই, তবে মনে ভর করে আরো বড় ভয়।
আসলে বাবার নদী থেকে ফেরার পথে সে জিউসের চোখে
পড়েছিল; দেখে দেবতা বলেন, ‘কুমারী তুমি জোভের লাভ
পাওয়ার যোগ্য, যার বেডে যাবে সে ধন্য হয়ে যাবে, ছায়া
পেতে বনের গহীনে যাও,’ (ছায়া কোনদিকে বেশি তা দেখিয়ে)
‘ভর দুপুরে সূর্য দেখো মাথার উপরে জ্বলছে অনেক।
হিংস্র জন্তুদের জায়গায় যদি একা যেতে ভয় লাগে
মনে রেখো দেবতার প্রহরায় একদম নিরাপদ তুমি,
আর আমি যেনতেন দেবতা না, আমার হাতের মুষ্টিতে
ঘুরে আকাশের মেরুদণ্ড, আমি হানি ভবঘুরে বজ্র।
আমার থেকে পালিয়ো না!’—কারণ দৌড় দিয়েছিল মেয়েটা।
লার্নার ঘাসী মাঠ ছেড়ে গাছে ঢাকা লির্সিয়াতে পালায়,
তখন দেবতা সারা দেশ ঘনান্ধকার কুয়াশায় ঢেকে
কিশোরীকে থামান এবং তার সম্মান হরণ করেন।
তখন জোভের বউ জুনো আর্গসের দিকে আকাশ থেকে
তাকিয়ে দেখেন রাত নামার অনেক আগে ভাসমান মেঘ
দিবাকে করেছে নিশা, দেখে বুঝতে পারেন উতলা নদীর
বাষ্প বা সেঁতসেঁতে মাটির নিশ্বাসে এটা হতে পারে না,
এবং তৎক্ষণাৎ তার জামাইয়ের খোঁজ করেন, কারণ
বহু বার ধরা খাওয়া বরের কুমতলব সব বউ বুঝে।
দেবকে স্বর্গে না পেয়ে দেবী বলেছিলেন, ‘হয় আমি ভুল,
নয় হইতেছি ফুল,’ এবং তখনি আকাশের চূড়া থেকে
এক উড়ালে মাটিতে নেমে সব মেঘকে সরে যেতে বলেন।
বউ আসার আগেই আসছে বুঝতে পেরে জিউস আয়োকে
কচি এক চকচকে বাছুরে রূপান্তরিত করে ফেলেন।
গাভী হয়েও সে ছিল সুন্দর। স্যাটার্নিয়া অনিচ্ছায়
বাছুরের প্রশংসা করে জানতেও চান তা কোন দেশের
কোন গোয়ালের থেকে এসেছে, যেন সত্য তার অজ্ঞাত!
সব প্রশ্ন থামিয়ে দিতে জিউস বলেছিলেন মাটি থেকে
তার জন্ম হয়েছে। জুনো তখন গাভীটা উপহার চান।
এখন কি করবেন তিনি? প্রেমিকা দিয়ে দেয়াটা নির্দয়,
না দেয়াটা সন্দেহজনক। শরম সাধে দেয়ার জন্য,
প্রেম তাতে বাদ সাধে। লজ্জা প্রেমের কাছে হার মানতই,
কিন্তু যে তার বোন আর বউ তাকে একটা গরুর মতো
সামান্য উপহার না দেয়ার অর্থ তা কেবল গরু না।
সতিন হাতিয়ে নেন জুনো, তাও নিশ্চিত হতে পারেন না,
চালাক জোভের ছলচাতুরিকে তখনো এমন ভয় তার,
তাই এরেস্টরের ছেলে আর্গাসকে পাহারায় লাগান।
আজব আর্গাসের মাথায় সাজানো ছিল একশটা চোখ,
তার মধ্যে দুইটা করে চোখ পালা করে বিশ্রাম নেয়,
যখন ঘুমায় দুই চোখ বাকিরা সজাগ থাকে প্রহরায়।
যেদিকে ফিরেই সে দাঁড়াত তার চোখ থাকত আয়োর দিকে;
পিছনের দিকে ফিরে থাকলেও আয়ো তার চোখের সামনে।
দিনের বেলায় ঘাস খেতে দিত, সূর্য পৃথিবীর তলায়
ডুবলে বন্দী করে তার নিরীহ গলায় পরাত শিকল।
গাছের পাতা ও তিক্ত ঘাস খেয়ে সে কোনমতে বেঁচে ছিল,
বিছানার বদলে মাটিতে ঘুমাত, মাটিতে ঘাসও থাকত না,
আর পিপাসা মিটাত একমাত্র নদীর কাদাটে পানিতে।
কখনো আর্গাসের কাছে দুহাত তুলে মোনাজাত করার
কথা ভাবে, কিন্তু কোনো হাত নাই যে দেখাবে আর্গাসকে!
কখনো অভিযোগের জন্য মুখ খুললে শুধু বের হয়
হাম্বা ডাক, নিজেই শিউরে উঠে নিজের গলার আওয়াজে।
বাবা ইনাকাসের যে নদীর তীরে সে আগে খেলত সেখানে
একবার আসে, কিন্তু পানিতে তার অলস চোয়াল আর
নতুন শিঙের প্রতিফলন দেখে আতঙ্কে কুঁচকে উঠে।
নায়াদ বোনরা আর বাবা ইনাকাস তাকে চিনতে পারেনি,
তাই অবাক হয় যখন একটা বাছুর গায়ে-গায়ে ঘেঁষে
তাদের কাছ থেকে আদর আশা করে আর মনোযোগ চায়।
বৃদ্ধ ইনাকাস কিছু ঘাস ছিঁড়ে তার মুখে তুলে ধরেন,
ঘাস খাওয়ার পর আয়ো বাবার হাতের তালুতে চুমু দেয়,
চোখের পানিও আটকে রাখে না, যদি শুধু শব্দ থাকত
এখনি নাম নিয়তি সব বলে তাদের সাহায্য চাইত।
কথা বলতে না পেরে সে খুর দিয়ে ধুলায় অক্ষর এঁকে
তার রূপান্তরের করুণ কাহিনি জানিয়েছিল তখন।
‘হায় রে কপাল!’ বলে উঠলেন ইনাকাস গুমরিয়ে উঠা
বাছুরের শিং আর তুষারশীতল গলা দুই হাতে ধরে;
গুঙিয়ে বলেছিলেন, ‘হায় রে কপাল! তুই আমার সে মেয়ে
যাকে সারা দুনিয়ায় খুঁজেছি? তোকে পাওয়ার দুঃখটা কেন
না পাওয়ার চেয়ে বড়! তুই কোনো কথা বলিস না, আমাদের
জবাব দেয়ার ভাষা নাই তোর, আছে শুধু বুকের গভীর
থেকে উঠা দীর্ঘশ্বাস, আব্বা না বলে ডাকিস হাম্বা।
এসব কিছু না জেনে আমি বিয়ের ব্যবস্থা করছিলাম,
স্বপ্ন দেখছিলাম তোর জামাইয়ের, আমার নাতিপুতির।
এখন বলদ হবে তোর জামাই, বাছুর হবে বাচ্চাকাচ্চা।
মৃত্যু দিয়ে যে এই দুঃখ মুছে ফেলব সে উপায়ও নাই,
দেবতাজীবন খুব দুঃখের, মৃত্যুর দরজা বন্ধ,
আমাদের যন্ত্রণা যে চলতেই থাকবে অনন্ত কাল!’
বাপ-মেয়ের শোকের বিলাপ চলতে থাকে যতক্ষণ না
তারাচোখা আর্গাস আয়োকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় বহুদূরে
আরেক ঘাসের মাঠে। সেখানে অনেক উঁচু এক পাহাড়ের
চূড়ায় বসে একশ চোখে গার্ড দেয় চারপাশ সব দিকে।
দেবতাদের শাসক আর সইতে পারেন না আয়োর এত
কষ্ট, এবং তার কৃত্তিকাদের ঘরে জন্মানো ছেলে
মার্কারিকে ডাকেন, আর্গাসকে মারার নির্দেশ দেন।
মার্কারির টাইম লাগে শুধু পরতে পাখাওয়ালা স্যান্ডেল,
হাতে নিতে ঘুমপাড়ানি জাদুর লাঠি, মাথায় পরতে ক্যাপ।
এই সব সাথে নিয়ে জিউসের ছেলে বাবার দুর্গ থেকে
এক উড়ালে মাটিতে নামে। নেমে সরিয়ে রাখে মাথার টুপি
আর পাখাওয়ালা চপ্পল, হাতে কেবল থাকে জাদুর লাঠি।
এইভাবে রাখালের বেশে ঘুরে বেড়ায় বিরান মাঠে, পথে
পাওয়া এক পাল ছাগল চড়ায় আর বাজায় নলের বাঁশি।
এই নতুন শব্দ জুনোর পাহারাদার শুনে বলে, ‘ওহে,
তুমি যে-ই হও না কেন, এই পাথরে বসো না আমার পাশে,
তোমার ছাগলদের জন্য পাবে না এর চেয়ে ভালো ঘাস,
আর রাখালের জন্যও এখানে আছে মনের মতো ছায়া।’
এটলাসের মেয়ের ছেলে তখন সেখানে বসে, এটা ওটা
দিয়ে আড্ডা জমায়, কথা বলে বাঁশি বাজিয়ে দিন কাটায়,
আর নিভাতে চেষ্টা করে একশটা দীপ্ত সজাগ চোখ।
তবে নিদ্রার সাথে যুদ্ধ করেই জেগে থাকে দারোয়ান,
কয়েকটা চোখকে সে ঠিকই ঘুমাতে দেয়, কিন্তু তখন
অন্য চোখদেরকে জাগিয়ে রাখে। এবং নলের বাঁশির
জন্মকথা জানতে চায়, কারণ তখনো তা বেশ নূতন।

দেবতা তখন বলেছিল, ‘আর্কেডিয়ার শীতল পাহাড়ে
এক নায়াদ থাকত—ননাক্রিসের সবচেয়ে বিখ্যাত
হামাড্রায়াড। তার পরী বোনরা তাকে সিরিংক্স ডাকত।
একাধিক বার তাকে পালাতে হয়েছিল স্যাটারদের থেকে,
ছায়াঘেরা অরণ্য আর বন্য গ্রামের বহু দেবতার
আক্রমণ থেকে। সে ভার্জিন থেকে অর্টিজিয়ার দেবীর
ইবাদত করত, ডায়ানার জামা পরিয়ে তাকে অনায়াসে
লিটোর কন্যা বলে চালিয়ে দেয়া যেতো, শুধুমাত্র যদি
তার ধনুক শিঙের না হয়ে ডায়ানার মতো সোনার হতো।
তবু তাকে দেবী বলে ভুল হতো। লাইসিয়াম পাহাড় থেকে
একদিন ফেরার পথে তাকে দেখে মাথায় পাইনের কাঁটা
পরা প্যান বলে’—রাখাল এখানে থামে, তার বলা বাকি ছিল
কিভাবে প্যানের থেকে পালিয়ে পরীটা পথহীন বনে ছুটে
যতক্ষণ না তার সামনে পড়ে লেডন নদীর শান্ত
বালুময় স্রোত, কিভাবে পানি দেখে সে তার পরী বোনদের
কাছে দোয়া করে যাতে তারা তাকে রূপান্তরিত করে দেয়,
কিভাবে যখন প্যান ভাবে অবশেষে সিরিংক্সকে পেয়ে গেছে
তখন দেখে হাতে পরীর শরীরের বদলে জলার নল।
সেখানে দাঁড়িয়ে প্যান যখন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল
তখন বাতাসের আদরে খাগড়ায় বিষাদের সুর বাজে।
অদ্ভুত মিষ্টি সে শব্দে মুগ্ধ হয়ে প্যান বলেছিল,
‘তোমার সাথে আমার এই সংগীত থেকে যাবে চিরকাল!’
তখন সে ছোট বড় বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের নল মোম দিয়ে
জোড়া লাগিয়ে বানায় বাঁশি যার নাম রাখে মেয়েটির নামে।

সেলিনির ছেলে এই গল্প পুরাটাই শোনাতে চেয়েছিল,
কিন্তু আগেই দেখে বন্ধ দারোয়ানের সবগুলা চোখ।
কাহিনি বন্ধ করে তখনি সে তার ঘুম আরো গাঢ় করে
তন্দ্রাবিষ্ট চোখের উপর নাড়িয়ে সেই জাদুর লাঠি।
এবং আর দেরি না করে তার বাঁকা তলোয়ারটা চালায়
যেখানে ঢুলুঢুলু মাথাটা লেগেছে ঘাড়ে—কাটা মুণ্ডুটা
পাহাড় গড়িয়ে পড়ে, রক্তে ভিজে যায় পবিত্র পাথর।
আর্গাস, তুমি লাশ এখন, তোমার সব বাতি নিভে গেছে,
এক আঁধার রাত্রি অধিকার করে নিয়েছে একশ চোখ।
ক্রোনাসের মেয়ে জুনো এই চোখগুলো তুলে তার ময়ূরের
লেজে লাগিয়ে তা সাজিয়েছিলেন তারার মতন জহরতে।
এবং তখনি তার ক্রোধ দপ করে জ্বলে উঠে যা নিভাতে
তার গ্রিক সতিনের মন ও চোখের পিছনে লেলিয়ে দেন
এক ভয়ানক ফিউরি, হৃদয়ে পুঁতে দেন উন্মাদ ভয়,
শঙ্কিত রেফুজির মতো আয়ো সারা পৃথিবী চড়ে বেড়ায়।
অবশেষে তার দুর্দশা দূর করেছিলে তুমি, নীল নদ।
তোমার পানিতে এসে বাছুর তীরের দিকে ঝুঁকে হাঁটু গেড়ে
ঢলে পড়েছিল, ঘাড় বাঁকিয়ে মুখটা তুলেছিল আকাশের
তারাদের দিকে, এছাড়া তোলার কিছু তো আর ছিল না তার;
গোঙানি, চোখের পানি আর শোকাতুর গম্ভীর ডাকে যেন
জোভকে নিন্দা করে সে তার কাছেই চায় দুখের ক্ষান্তি।
জুপিটার তার বউয়ের গলা দুই হাতে জাপটিয়ে ধরে
প্রেমিকার শাস্তির অবসান চেয়ে বলেন, ‘তোমার ভয়
সব সরিয়ে রাখো, ভবিষ্যতে ও কখনো তোমার দুখের
কারণ হবে না।’ স্টিক্সের জল সাক্ষী রেখে বলেছিলেন।
দেবী শান্ত হওয়ায় আয়ো ফিরে পেয়েছিল পূর্বের রূপ;
আগে যা ছিল আবার তা হয়: শরীর থেকে ঝরে পড়ে লোম,
থাকে না লম্বা শিং, বিশাল দুইটা চোখ ছোট হয়ে আসে,
চোয়াল সংকুচিত হয়, ফিরে আসে হাত আর আগের পা,
খুর বিভক্ত হয়ে আবার ফিরিয়ে দেয় পাঁচ আঙ্গুল;
গাভী রূপের কিছুই থাকে না দুধের মতো শুভ্রতা ছাড়া।
আবার দুই পা ফিরে পেয়ে পরী খুশি হয়, দুপায়ে দাঁড়ায়,
কিন্তু গরুর ডাক বের হবে ভেবে কথা বলার সাহস
পায়নি, বহুদিন ভুলে থাকা শব্দ ভয়ে ভয়ে মুখে আনে।
দেবী হিসেবে এখন তার পূজা করে লিনেনপরা সাধুরা।
এপাফাস নামে তার এক ছেলে হয় যাকে লোকে জিউসের
ছেলে ভাবত, মায়ের পাশে তার মন্দির হতো মিশরের
সব শহরে। তার ছিল এক বন্ধু তার সমান বয়সে
ও মেজাজে—সূর্যের ছেলে ফাইথন। একবার সে গর্ব
করে কথা বলছিল বাবা ফিবাস নিয়ে, কোনভাবেই মুখে
লাগাম না টানায় ইনাকাসের নাতি বলে, ‘তোর মা যা বলে
বিশ্বাস করিস, হাবা? মিথ্যা বাবা নিয়ে কিসের বড়াই!’
ফাইথন লাল হয়, তবে লজ্জা লুকিয়ে রাখে তার রাগ,
এপাফাসের এই অপমান নিয়ে যায় মা ক্লিমিনির কাছে;
‘আরো খারাপ হচ্ছে, মা’ সে বলেছিল, ‘এত স্বাধীন শক্ত
হয়েও আমি কিছু বলিনি। এমন জঘন্য গালি খেয়েও
উচিত জবাব দিতে না পারার চেয়ে লজ্জার কিছু আছে?
যদি আমার বাবা আসলেই দেবতা হয়ে থাকে, তবে তুমি
এখনি প্রমাণ দাও, যাতে বুঝে পাই স্বর্গে আমার দাবি।’
এই বলে দুই হাত ছুঁড়ে সে মায়ের গলা আঁকড়িয়ে ধরে,
নিজের ও সৎ বাবা মেরপ্সের জীবনের নামে, মাসিদের
বিয়ের নামে দিব্যি কেটে সত্য বাবার সংকেত চায়।
ক্লিমিনি ক্লিষ্ট হন, তবে ছেলের অপমানে না কি নিজের
তা ঠিক বুঝা যায় না, তারপর দুই হাত আসমানে তুলে
সূর্যের উজ্জ্বল আলোর দিকে সরাসরি চেয়ে বলেন,
‘আলোর কিরণ পরা ঐ দীপ্ত বৃত্ত, যে আমাদেরকে
দেখতেছে, আমাদের কথা শুনতেছে তার শপথ, আব্বু,
যাকে দেখতেছিস সে সূর্য থেকে, বিশ্ব শাসন করা
আলো থেকে তোর জন্ম। যদি মিথ্যা বলি, সে আর আমাকে
দেখা না দিক, আমার চোখ কাল থেকে আর আলো না দেখুক!
কিন্তু বাবার বাড়ি খুঁজে পেতে তোর কোন দেরিও হবে না,
যেই দেশ থেকে তার উদয় তা আমাদের সীমানার পাশে।
যদি মন চায় গিয়ে সূর্যকে সরাসরি জিজ্ঞাস কর।’
মায়ের এই কথায় ফাইথনের হৃদয়ে খুশির তুফান
বয়ে যায় আর মন জুড়ে ভর করে স্বর্গের কল্পনা,
তক্ষুনি ইথিওপিয়া ছেড়ে সে অগ্নির দেশ ইন্ডিয়া
পার হয়, তারপর আগায় যেদিকে বাবার উদয়াচল।



Leave a Reply
Want to join the discussion?Feel free to contribute!