অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত ১: ভগবতপ্রসূতি

ইউরোপ-ইসলাম-ইন্ডিয়া (ইইই) সিরিজের প্রস্তুতি হিসাবে ওভিডের ‘মেটামর্ফোসিজ’ আর হাফিজের ‘দিওয়ানের’ পর শুরু করলাম অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’, বুদ্ধের সারা জীবন নিয়ে লেখা সবচেয়ে প্রাচীন কবিতা। ইউরোপ থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত যত কালচার আছে তাদের পানি উপচে পড়েছে অনেক জায়গায়, ইউরোপ থেকে আমেরিকায়, ইসলামি বিশ্ব থেকে আফ্রিকায়, ভারত থেকে চীনে। তাই ইইই’র আয়নাতে আরো অনেক কালচার দেখা যায়। অনেক কালচারের আগুনে রান্না করা সব্জির স্বাদ পাওয়ার জন্য পারফেক্ট উছিলা অশ্বঘোষ, সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম আত্মসচেতন লেখক। ‘মহাভারত’ ব্যাস একা লিখেননি, ‘রামায়ণ’ বাল্মীকি একা লিখেননি, ‘বুদ্ধচরিত’ অশ্বঘোষ একা লিখেছেন। এই প্রথম একজন ভারতীয় লেখক নিজের নামে লেখা প্রকাশ করছেন, এমনকি ‘কাব্য’ ধারার জনকও অনেক সময় তাকেই বলা হয়। তার স্থানকাল একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝা যাবে কেন তাকে হাজার কালচারের আগুনে রান্নার পানি ফুটানোর জন্য আদর্শ উছিলা বললাম।

অশ্বঘোষের জন্ম অযোধ্যায়। ট্রেডিশন বলে, যখন তিনি বেনারসে থাকতেন তখন সেই শহর আক্রমণ করেন কুষাণ ডিনেস্টির সবচেয়ে সফল রাজা কণিষ্ক, ১০০ সালের দিকে, ব্ল্যাকসি’র পারে ওভিডের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পরে। চীনের গান্সু অঞ্চলে বাস করা ইউয়েজি গোত্র খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে জিওংনু গোত্রের আক্রমণে চীন ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর, প্রথমে পূর্বে উজবেকিস্তানের সোগদিয়ানা এবং পরে দক্ষিণে আফগানিস্তানের বাক্ত্রিয়া দখল করে গ্রিকদের কাছ থেকে। বাক্ত্রিয়ার (রাজধানী বালখ) ইউয়েজিদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয় কুষাণ ডিনেস্টি। কণিষ্কের সময় কুষাণ সাম্রাজ্য ছিল পূর্ব-পশ্চিমে বুখারা থেকে পাটনা আর উত্তর-দক্ষিণে পামির থেকে বিন্ধ্য পর্যন্ত, রাজধানী বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার। বৌদ্ধ ধর্ম আর ইউরোপ থেকে ইন্ডিয়া ও চীন পর্যন্ত কানেকশনের জন্য এটা ছিল যুগান্তকারী সময়। কণিষ্কের অধীনে কাশ্মীরে চতুর্থ বৌদ্ধপরিষদ হয় অশ্বঘোষের তত্ত্বাবধানে, এবং সিল্ক রোডের মাধ্যমে পশ্চিমে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ আর পূর্বে চীনের মধ্যে যোগাযোগ নতুন মাত্রা পায়।

সিল্ক রোডের মাধ্যমেই ভারত থেকে পূর্বে যায় বৌদ্ধ ধর্ম। কণিষ্কের রাজত্ব ছিল বৈচিত্রের চুলা, অনেক কালচারের সাগর। তিনি কথা বলতেন সম্ভবত বাক্ত্রিয়ান ভাষায়, যা ফার্সি-হিন্দির কাছাকাছি হলেও লেখা হতো গ্রিক বর্ণমালায়। সাহিত্যের চর্চা হতো প্রধানত সংস্কৃত ভাষায়। সে আমলেই পেশোয়ার ও তক্ষশীলার আশপাশে গান্ধার আর্টের জন্ম হয়, যার বুদ্ধমূর্তি দেখতে এপোলোর মতো। অশ্বঘোষের সময় বৌদ্ধ ধর্মের যাকিছু সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল গান্ধার এলাকায়, তার অনেক কিছু সংরক্ষিত আছে চাইনিজ ও তিব্বতি অনুবাদের কারণে। মহারাজার সাথে মহাকবির নাম জোর করে মিলিয়ে দেয়ার একটা প্রথা চালু আছে জানি, তবুও কণিষ্কের সাথে অশ্বঘোষের নাম মিলানোর লোভ সামলানো সম্ভব না। বৌদ্ধ দার্শনিক কুমারজীব ৪০০ সালের দিকে অশ্বঘোষের একটা জীবনী লিখেছিলেন চাইনিজ ভাষায়। সেটার ইংলিশ অনুবাদ ২০০২ সালে প্রিন্সটন থেকে বের করেন স্টুয়ার্ট ইয়াং। এই ইংলিশ থেকেই অশ্বঘোষ ও কণিষ্কের মিথ শোনা যাক।

কণিষ্ক বেনারস দখলের পর রাজার কাছে দূত পাঠিয়ে বললেন, “আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তিন লাখ স্বর্ণ দাও, তাহলে মাফ পাবে।” বেনারসের রাজা দূতের মাধ্যমে জানালেন, “আমার গোটা রাজ্যের দাম এক লাখ স্বর্ণের বেশি না, তিন লাখ কোথায় পাব?” কণিষ্ক জানালেন, “তোমার রাজ্যে দুই সম্পদ আছে, বুদ্ধের ভিক্ষার বাটি, আর একজন অনন্যসাধারণ ভিক্ষু। এই দুটি দিলে দুই লাখ স্বর্ণের সমান হবে।” রাজা জানান, “এই দুটি আমার কাছে অনেক দামী, দিতে পারব না।” তখন অশ্বঘোষ তার রাজাকে বলেন, “জীবিত সত্তার জীবন সবার আগে। ভিক্ষু মানুষ বাঁচায়। অন্তরে মঙ্গল থাকলে, দূর বা নিকট বলে কিছু থাকে না। তাই শুধু নিকটে যা আছে তা দেখলে চলবে না, দূরদৃষ্টি দরকার।” এতে রাজা বাটি ও ভিক্ষু দিতে রাজি হন। কণিষ্ক সব নিয়ে খুশি মনে পেশোয়ার ফিরে যান, কিন্তু তার মন্ত্রীরা খুশি হতে পারেন না, রাজাকে বলেন, “বুদ্ধের বাটি ঠিক আছে, কিন্তু এই ভিক্ষুর মূল্য এক লাখ স্বর্ণের সমান হতে পারে না।” রাজা জানতেন অশ্বঘোষের মূল্য, সেটা তাদের বুঝানোর জন্য সাতটা ঘোড়াকে ছয়দিন ধরে কিছু খেতে না দিতে বলেন। ষষ্ঠ দিন সকালে রাজ্যের সব শ্রমণকে জড়ো করে অশ্বঘোষকে বলেন ধর্ম শিখাতে। তার আগে ক্ষুধার্ত ঘোড়াদের সামনে তাদের প্রিয় প্লবন-ঘাস রাখেন। কিন্তু অশ্বঘোষের ধর্মকথায় শুধু শ্রমণরা যে হতবাক হয় তাই না, একটা ঘোড়াও মুখে ঘাস তুলে না, অবাক হয়ে সব কথা শোনে। সেই থেকে কুষাণ সাম্রাজ্যে বেনারসের ভিক্ষুর মূল্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঘোড়ারা তার ঘোষণা বুঝেছিল বলে সেদিন থেকে তার নাম হয় ‘অশ্বঘোষ’।

এই অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিতের’ ২৮টা সর্গ (অধ্যায়) সম্পূর্ণ সংরক্ষিত আছে চাইনিজ অনুবাদে, কিন্তু মূল সংস্কৃতে সংরক্ষিত আছে শুধু প্রথম চৌদ্দ সর্গ। প্রথম সর্গ আমি সংস্কৃতে “পড়া” শেষ করলাম। মানসরোবর ওয়েবসাইটে যা প্রকাশ করেছি তাকে অনুবাদ না বলে রিডিং বলছি; আমি আসলে অনুবাদ করছি না, কেবল পড়ছি, এবং সবাইকে দেখাচ্ছি কিভাবে পড়ছি। নিচে দেয়া গুগল স্প্রেডশিটে গেলে বুঝা যাবে রিডিং বলতে কি বুঝাচ্ছি। স্প্রেডশিটে বাংলা ও সংস্কৃত পাশাপাশি দেয়া আছে। অনেক লাইনে সংস্কৃতের সবগুলো শব্দই বাংলায় হুবহু রেখে দেয়া সম্ভব হয়েছে, বাংলায় আমাকে যা করতে হয়েছে তা হলো পুনর্বিন্যাস, আর কিছু না। মূল সংস্কৃতের যত শব্দ রাখা সম্ভব সবই রেখেছি, অনুবাদ দুর্বোধ্য করে হলেও, কারণ এআই থাকার কারণে এই যুগে কেউ দুর্বোধ্যতার দোহাই দিতে পারে না, যেকোনো শব্দের অর্থ বুঝা যেহেতু এক ক্লিকের ব্যাপার। ভগবতপ্রসূতি (বুদ্ধের জন্ম) নামের প্রথম সর্গের প্রায় পুরোটাই অশ্বঘোষ লিখেছেন ঋগ্বেদের ত্রিষ্টুভ ছন্দে, যেখানে প্রত্যেক শ্লোকে ১১ সিলেবলের ৪টা করে লাইন আছে। সেটা ফলো করা অসম্ভব, আমার প্রত্যেক লাইনে আছে বাংলা মিশ্রছন্দের ১৪টা করে মাত্রা। ‘বুদ্ধচরিতের’ অর্ধেকেরও বেশি শব্দ বাংলায় আছে, কিন্তু সংস্কৃতের গ্রামার আলাদা বলে তাও অনেক লাইন স্পষ্ট বুঝা যায় না। ভালোভাবে বুঝার জন্য ইউজ করেছি চ্যাটজিপিটি এবং দুই জনের ইংলিশ অনুবাদ: ইর্মা স্কটসম্যানের পদ্যানুবাদ আর এডওয়ার্ড জনস্টনের গদ্যানুবাদ। তাহলে পড়া যাক জন্মান্তরনাশী এক জন্মের কথা, যে জন্ম হয়েছিল জগতে মোহের তম নিহন্তার জন্য, যে “জন্মের সময় গিরিতে গাঁথা ভূমিও বাতাহত নৌকার মতো কেঁপেছিল”।


ইক্ষ্বাকুর মতো প্রভাবশালী ঐক্ষ্বাক,
শাক্য অশাক্য সকলের মাঝে বিশুদ্ধ,
প্রজার কাছে শরচ্চন্দ্রের মতো প্রিয়
শুদ্ধোদন নামের এক রাজা ছিলেন।

ইন্দ্রের মতো রাজার এক স্ত্রী ছিলেন
দীপ্তিতে নরেন্দ্রদের সমান প্রভাবী,
যেন পদ্মে লক্ষ্মী, পৃথিবীর মতো ধীর,
নাম মায়া, অনুপম মায়ার মতন।

তার সঙ্গে রাজা বিহার করতেন
বৈশ্রবণের লক্ষ্মী নিয়ে চিন্তা না করে;
তিনি বিধির মতো সমাধিমগ্ন হয়ে
গর্ভ ধারণ করেন পাপবিবর্জিত।

গর্ভধারণের আগে সে রাজার পত্নী
সাদা রঙের রাজহাতি দেখেছিলেন
এক স্বপ্নে তার দেহে প্রবেশ করছে,
কিন্তু কোন তাপ অনুভব করছেন না।

দেবপ্রতীম সেই মহারাজার দেবী
গর্ভে ধারণ করেছিলেন বংশের শ্রী
শ্রম ছাড়া কষ্ট ছাড়া অসারতা ছাড়া;
নিভৃত বনবাস ছিল তার আকাঙ্ক্ষা।

বনের প্রান্তে লুম্বিনী নামে এক ভূমি
বিচিত্র বৃক্ষে যেন অভিরাম চৈত্ররথ;
ধ্যানের অনুকূল সে বিজন জায়গা
তিনি চান রাজার কাছে বাসের জন্য।

আর্যস্বভাব ধর্মপ্রবণ ভূমিপতি
তা জেনে কৌতূহল ও হর্ষে পূর্ণ হন
এবং শিব পুরী থেকে যাত্রা করেন,
নিজের প্রীতি না, স্ত্রীর বিহারের জন্য।

সেই ঘন বনে শ্রীমতি রাজপত্নী
প্রসূতিকাল আসছে তা লক্ষ করে
শুয়ে পড়েন বিতানে ছাওয়া বিছানায়
সহস্র নারীর অভিনন্দনের মাঝে।

তারপর পুষ্যা যখন প্রসন্ন হয়
ব্রতে সংস্কৃত সেই দেবীর জন্য,
পার্শ্ব থেকে পুত্র জন্মায় লোকহিতে,
যেমন নির্বেদহীন তেমন নিরাময়।

যেমন ঊরু থেকে ঔর্ব, হাত থেকে পৃথু,
আর মাথা থেকে ইন্দ্রপ্রতিম মান্ধাতা,
অথবা ভুজের দেশ থেকে কক্ষীবৎ,
তেমন ভাবেই হয়েছিল তার জন্ম।

ক্রমে গর্ভ থেকে অভিনিঃসৃত হলেন
তিনি যেন স্বর্গচ্যুত, যোনিজাত নন,
অনেক কল্প ধরে ভাবনারত আত্মা
সবজান্তা হিসেবে জন্মান, মূঢ় নয়।

দীপ্তি আর ধৈর্যে যিনি ছিলেন ভাস্বর,
যেন বালক রবি ভূমিতে অবতীর্ণ,
এত দীপ্তি থাকা সত্ত্বেও নিরীক্ষ্যমাণ,
শশাঙ্কের মতোই জুড়িয়ে দেন চক্ষু।

নিজ গায়ের প্রভায় উজ্জ্বল তিনি
যেন দীপের প্রভা ম্লান করা ভাস্কর,
জাম্বুনদ সোনার মতন চারুবর্ণ
তার বিদ্যুতে আলোকিত সব দিক।

ন্যুব্জ নয়, অনাকুল ও সমুদ্গত,
নিষ্পেষণের মতন বিক্রমে বিস্তৃত,
আর একইসাথে ধীর সাত পদক্ষেপে
সপ্তর্ষি তারা সদৃশ তিনি চললেন।

“জন্মেছি বোধের জন্য জগতের হিতে,
এ ভবোৎপত্তি দিয়েই আমার ইতি,”
সিংহগতির তিনি চারদিকে তাকিয়ে
বলেন ভবিষ্যতের স্বার্থে এই কথা।

আকাশপ্রস্রুত চন্দ্রমরীচিতে শুভ্র
দুই বারিধারা, উষ্ণ শিশিরশীতল,
শরীরের সংস্পর্শ থেকে সুখ দিতে
এসে পড়েছিল সৌম্য তার মাথায়।

শ্রীমান বিতানে কনক-উজ্জ্বল অঙ্গে
তিনি শায়িত বৈদূর্য-পায়ের শয্যায়,
যার গৌরব দেখে কাঞ্চনপদ্ম হাতে
চারদিকে দাঁড়িয়েছে যক্ষাধিপতিরা।

অদৃশ্য ভাবের দিব্য সব সত্তা ছিল
তার প্রভাব দেখে শির প্রণত করে,
উপরে আকাশে ধরে পাণ্ডুর ছাতা,
বোধের জন্য জপ করে পরমাশিস।

মহানাগেরা বিশেষ ধর্মের তৃষ্ণায়
ও অতীত বুদ্ধদের অধিকারে তাকে
ভক্তিভরা নেত্রে ব্যজন করছিলেন,
মন্দার পুষ্পের ঝড়ে সমাকীর্ণ করে।

তথাগতের জন্মগুণে তুষ্ট হলেন
শুদ্ধাধিবাসী আর বিশুদ্ধ সব সত্তা,
রাগ দূর হলেও দেবতারা আনন্দিত
হলেন দুঃখে নিমগ্ন জগতের হিতে।

জন্মের সময় গিরিতে গাঁথা ভূমিও
বাতাহত নৌকার মতো কেঁপেছিল,
চন্দনের গন্ধে ভরা উৎপল পদ্মের
বৃষ্টি পড়ছিল নিরভ্র গগন থেকে।

মনোজ্ঞ বাতাস বইছিল সুখস্পর্শ,
যেন ছড়িয়ে পড়ছিল দিব্য বসন,
আগের সূর্যই ছিল আরো চকচকে,
অগ্নির অর্চিও জ্বলেছিল সৌম্যভাবে।

প্রাসাদের পূর্বোত্তর প্রদেশের কোণে
স্বয়ং আবির্ভূত হয় স্বচ্ছ পানির কূপ,
আগত অন্তঃপুরিকারা বিস্মিত হয়ে
সেখানে তীর্থের মতো কৃত্য শুরু করে।

যারা ধর্মান্বেষী দেবতুল্য ভূত তারা
শুধু তার দর্শনার্থে পূর্ণ করে বন,
আর তাদের কৌতূহলে গাছগাছালি
অকালেই ঝরিয়ে ফেলে তাদের ফুল।

হিংসা পরিত্যাগ করে অশান্ত ভূতেরা,
পর বা স্বজাতকে পীড়া দেয় না আর,
এবং বিনা প্রচেষ্টায় জগতের সব
রোগ থেকে মানুষের উপশম হয়।

মৃগপক্ষী কলকণ্ঠে ডাকা শুরু করে,
শান্ত পানি বয়ে যায় সরিতের স্রোতে,
সব দিক বিমল হয়ে উঠে, নিরভ্র
আকাশে দুন্দুভির নিনাদ বেজে উঠে।

লোকের মোক্ষে যখন গুরু জন্মালেন
অব্যবস্থার জগতে নেমে এল শম,
যেন নিশ্চিত পেয়েছে নীতিমন্ত নাথ,
জগতে আমোদ পায়নি কেবল মার।

দিব্য অদ্ভুত সে-জন্ম নিরীক্ষণ করে
ধীর রাজা বহু ক্ষোভে আলোড়িত হন।
স্নেহ থেকে ভীতি আর প্রমোদের জন্য
দুই বারিধারা বের করেন নরেন্দ্র।

তার অমানুষী শক্তির কথা শুনে
করুণার্দ্রচিত্ত প্রকৃতির মা
দেবী প্রীত হন আবার ভীতও হন,
যেন শীতোষ্ণ জলের এক মিশ্র ধারা।

তাদের ভয়ের হেতু নিরীক্ষণ করে
ধ্যান ত্যাগ করেন প্রবৃদ্ধ বনিতারা,
বরং পূত হয়ে মঙ্গলকর্ম করেন
ও শিশুর শিব চান সুরদের কাছে।

শ্রুতি শীল বাগ্মিতায় বিখ্যাত বিপ্ররা
নিমিত্ত শুনে ও সম্যক বিচার করে,
প্রফুল্ল বিস্মিত আর দীপ্তিমান মুখে
ভীত প্রসন্ন নৃপতিকে এসে বললেন:

“ভূমিতে কামনা করে শান্তি যে সত্তারা
তারা পুত্র ছাড়া আর কোনো গুণ চায় না,
তোমার এ পুত্র হলো কুলের প্রদীপ,
রাজা, নৃত্যোৎসবের আয়োজন করো।

চিন্তা ত্যাগ করে তুমি শান্তচিত্ত হও,
বংশ বৃদ্ধির ভাগী বলে আমোদ করো,
তোমার এই পুত্র হবে লোকের নেতা,
জগতে দুঃখে অর্দিত সকলের ত্রাতা।

কনকোজ্জ্বল অঙ্গে দীপের মতো প্রভা,
সব সুলক্ষণে সমন্বিত এই শিশু
সকল গুণের নিধি, সময়ে সে পাবে
বুদ্ধঋষির ভাব বা পরম ঐশ্বর্য।

তার ইচ্ছা যদি হয় পৃথিবীর ঐশ্বর্য,
ন্যায়ের মাধ্যমে জিতে সমগ্র পৃথিবী
রাজাদের রাজা হবে, যেমন প্রকাশ
পায় সব গ্রহের মাঝে রবির বিভা।

আর যদি সে মোক্ষের জন্য বনে যায়
সম্যক তত্ত্ব দিয়ে জয় করবে সব
মত পৃথিবীর, সম্মান পাবে এত যে
সব শৈলের মাঝে হবে রাজা সুমেরু।

ধাতুদের মধ্যে শুচি যেমন হিরণ,
গিরির মাঝে মেরু ও সরসে সমুদ্র,
তারার মাঝে চন্দ্র, তাপীর মধ্যে সূর্য,
তেমন তোমার পুত্র দ্বিপদীর শ্রেষ্ঠ।

নির্নিমেষ ও বিশাল তার দুই চোখ,
যেমন স্নিগ্ধ ও দীপ্ত তেমন বিমল,
তাতে নিষ্কম্প আয়ত কৃষ্ণ শুদ্ধ পক্ষ্ম,
সত্যিই সকল ভব দেখতে সমর্থ।”

“নিশ্চিত কি কারণে এভাবে বলছেন
যে কুমারের আছে এমন শ্রেষ্ঠ গুণ
যা পূর্বের কোনো মুনি রাজার ছিল না?”
রাজার এ জিজ্ঞাসায় দ্বিজরা বলেন,

“খ্যাতনামা সব কর্ম, যশ আর মতি,
যা পূর্বে না থাকলেও এসেছিল পরে,
সেই সব গুণের পিছনে হেতু আছে;
এ ব্যাপারে কিছু নিদর্শন বলি শোনো।

যে রাজশাস্ত্র অঙ্গিরা ও ভৃগুর মতো
দুই ঋষি আয়ত্ত করতে পারেননি,
হে সৌম্য, তা সৃষ্টি করেছিল সময়ে
তাদের দুই পুত্র বৃহস্পতি ও শুক্র।

সারস্বত শুনিয়েছিলেন নষ্ট হওয়া
বেদ পুনরায় যা পূর্বজরা শোনেনি,
আর ব্যাস তা বহু ভাগে ভাগ করেন
যে কাজের শক্তি আগে বশিষ্ঠের হয়নি।

আদিতে বাল্মীকি পদ্য রচনা করেন
যা গ্রন্থন করেননি মহর্ষি চ্যবন,
যে চিকিৎসাবিদ্যা অত্রি পারেননি
পরে তার কথা বলেন আত্রেয় ঋষি।

যেই দ্বিজত্ব কুশিক লাভ করেননি
গাধির পুত্র তা পেয়েছিল, হে রাজন;
সমুদ্রের বেলা বেঁধেছিলেন সগর
কোনো ঐক্ষ্বাকই যা প্রথমে বাঁধেনি।

দ্বিজদের যোগ শেখাতে আচার্য-পদ
পান জনক যা অন্যের অপ্রাপ্ত ছিল,
শৌরির যেসব কর্ম বিখ্যাত হয়েছে
শূরদের তা করার ক্ষমতা ছিল না।

তাই বয়স বংশ কিছুর প্রমাণ না,
যে-কেউ যে-কোথাও পেতে পারে শ্রেষ্ঠতা,
রাজা আর ঋষিদের কত কিছু আছে
যা পুত্র করেছে আর পূর্বজ করেনি।”

এইভাবে নৃপতি প্রত্যয়ী দ্বিজদের
দ্বারা অভিনন্দিত ও আশ্বস্ত হলেন,
মনে অনিষ্টের সব শঙ্কা ত্যাগ করে
আরো বেশি হর্ষে আরোহণ করলেন।

আর শ্রেষ্ঠ দ্বিজদের প্রতি প্রীত হয়ে
সৎকার সহ দিলেন অনেক ধন,
যাতে তাদের কথার মতো ভূমিপতি
হয় পুত্র ও জরায় করে বনযাত্রা।

তখন নিমিত্ত আর তপোবল দিয়ে
জন্মান্তরনাশী এক জন্ম হলো বুঝে
শাক্যেশ্বরের সে আলয়ে এসেছিলেন
সত্য ধর্মের তৃষ্ণায় মহর্ষি অসিত।

যে ব্রহ্মবিদ জ্বলন্ত ব্রাহ্মী মহিমা ও
তপের মহিমায়, তাকে রাজার গুরু
আরেক ব্রহ্মবিদ গৌরবে সৎক্রিয়ায়
নরেন্দ্রর প্রাসাদে প্রবেশ করালেন।

প্রাসাদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন
শুধু কুমার জন্মের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে,
কারণ বনবাসের মতো ধীর তিনি
তপের প্রকর্ষে আর জরার আশ্রয়ে।

এবং মুনিকে আসনে বসিয়ে নৃপতি
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে সম্যক পূজা করেন
ও যথা উপচারে নিমন্ত্রণ করেন
বশিষ্ঠকে অন্তিদেবের মতো সম্মানে:

“আমি ধন্য, এ কুলের জন্য অনুগ্রহ
যে ভগবান আমাকে দেখতে এলেন;
আজ্ঞা করুন, হে সৌম্য, কি করতে হবে
এই শিষ্যকে? বিশ্রম্ভ রাখতে পারেন।”

এভাবে নৃপতির নিমন্ত্রণের পরে
মুনি যথাযথভাবে সব দিক ভেবে
বিস্ময়ে উৎফুল্ল বিশাল দৃষ্টি দিয়ে
গম্ভীর ও ধীর স্বরে কথা বললেন:

“মহাত্মা, এ আচরণ তোমারই সাজে,
তুমি অতিথিপ্রিয় ত্যাগী ও ধর্মকামী,
সত্ত্বান্বয় জ্ঞান ও বয়সে অনুরূপ,
যদি আমার প্রতি এমন স্নিগ্ধ হও।

এই সেই পথ যা দিয়ে রাজঋষিরা
সূক্ষ্ম ধর্মের মাধ্যমে ধন লাভ করে
ও বিধিমতো নিত্য তা ত্যাগ করে হন
তপস্বায় ধনাঢ্য ও বৈভবে দরিদ্র।

আমি কি প্রয়োজনে এসেছি এইখানে
তা তুমি এখন শোনো আর প্রীত হও।
আদিত্যপথে শুনেছিলাম দিব্য বাণী:
‘বোধের জন্য জন্মেছে তোমার তনয়।’

সেই কথা শুনে আর মন যুক্ত করে
লক্ষণ দিয়ে তা বুঝেই আমি এসেছি,
দেখার ইচ্ছায় শাক্যকুলের সে ধ্বজা
যা সমুচ্ছ্রিত হলো শক্রধ্বজার মতো।”

এভাবে এই সব কথা শোনার পরে
প্রহর্ষে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে সেই নরেন্দ্র
ধাত্রীর অঙ্কে শায়িত কুমারকে নিয়ে
উৎসুক তপোধনকে দেখিয়েছিলেন।

মহর্ষি দেখলেন পায়ে চক্রের চিহ্ন,
হাত পায়ের আঙুল জালে অবনদ্ধ,
সোনালি যুক্ত ভ্রু, হাতির মতন ঢাকা
অণ্ডকোষ রাজপুত্রের, বহু বিস্ময়ে।

ধাত্রীর অঙ্কে সংবিষ্ট শিশু দেখে মনে
হয় দেবীর অঙ্কে সংবিষ্ট অগ্নিপুত্র,
অশ্রু ঝরে মুনির বিকম্পিত পক্ষ্মান্তে,
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্রিদিবে উন্মুখ হন।

অসিতের অশ্রুপরিপ্লুত আঁখি দেখে
অনূজের স্নেহে রাজা কাঁপতে থাকেন,
গদগদ আর বাষ্পভারী কণ্ঠে তিনি
আনত অঙ্গে প্রাঞ্জলি তুলে বললেন,

“সুর থেকে যার বপুর অন্তর অল্প,
যার দীপ্তিময় জন্ম বহুৎ অদ্ভুত,
অতি উত্তম বললেন যার ভবিষ্যৎ
তার প্রেক্ষায় আপনার বাষ্প কেন, ধীর?

ভগবান, কুমার কি দীর্ঘ আয়ু পাবে?
সে কি আমার শোকের জন্যই প্রসূত?
কোনমতে পেলাম এক সলিলাঞ্জলি,
না জানি তাই পান করতে আসে কাল।

আমার যশের নিধি কি অক্ষয় হবে?
কুলহস্তসার কি নিশ্চিত ধ্রুব হবে?
পরকালের প্রয়াস কি সুখের হবে?
সুপ্তিতে থাকবে পুত্রে অনিমিষ চক্ষু?

আমার কুলে আসল যে নতুন প্রবাল
তা ফুল না হয়েই হবে শোষের ভাগী?
ক্ষিপ্রতা নিয়ে বলুন, বিভু, শান্তি নেই;
জানেন তো সুতের প্রতি বান্ধবের স্নেহ।”

এই রকম অনিষ্ট বুদ্ধির আবেগে
নরেন্দ্র কাতর বুঝে মুনি বললেন,
“তোমার না হোক আর অন্য মতি, রাজা,
আমি যাকিছু বলেছি সব নিঃসংশয়।

তার অন্যথায় হয়নি আমার বিক্রিয়া,
আমি বিক্লব নিজের প্রবঞ্চনা দেখে।
আমার যাওয়ার কাল এসেছে যখন
জন্মাল জাতিক্ষয়ের অসুলভ বোদ্ধা।

রাজ্য ত্যাগ করে, বিষয়ে অনাস্থা নিয়ে
তত্ত্ব অধিগম্য করবে তীব্র প্রযত্নে;
জগতে মোহের তম নিহন্তার জন্য
জ্ঞানময় সে জ্বলবে সূর্যের মতন।

দুঃখের অর্ণবের ব্যাধি বিকীর্ণ ফেনা,
জরা তরঙ্গ, আর মরণ উগ্র বেগ;
উত্তরণ করবে সে মুহ্যমান এই
মর্ত জগৎ জ্ঞানের মহাপ্লব দিয়ে।

যার বেগ প্রজ্ঞাপানি, পার স্থিরশীল,
শীতলতা সমাধি ও চক্রবাক ব্রত,
তার সে উত্তম ধর্মনদীর প্রবাহ
পান করবে তৃষ্ণা-অর্দিত জীবলোক।

যারা দুঃখে অর্দিত ও বিষয়ে আবৃত
হয়ে আছে সংসারের এ কান্তারপথে,
তাদের ব্যাখ্যা করবে সে বিমোক্ষমার্গ,
পথহারা পথিককে যেমন করা হয়।

জগতের জনগণ যারা দহ্যমান
রাগের আগুনে যার ইন্ধন বিষয়,
তাদের প্রহ্লাদ দেবে তার ধর্মবৃষ্টি,
যেন আতপ শেষে মহামেঘের বৃষ্টি।

মোহের তম কপাটে তৃষ্ণার অর্গল,
সকল প্রজার অপনয়নের দ্বার
সে উন্মোচন করবে উত্তম উপায়ে
তার সৎ ধর্মের দুরাসদ তাড়নে।

নিজেদের মোহপাশে পরিবেষ্টিত
দুঃখে অভিভূত আর নিরাশ্রয়
জগতকে সম্বুদ্ধ ধর্মরাজ
বন্ধন থেকে দান করবে মোক্ষ।

তাই তুমি তার জন্য শোক করো না,
করো মনুষ্যলোকে শোচনীয় তার জন্য
মোহে অথবা কামসুখের মত্ততায়
যে শুনবে না নৈষ্ঠিক তার ধর্ম।

তাই সেই গুণ থেকে ভ্রষ্ট বলে আমি
ধ্যানের বহু ধাপে উঠেও অকৃতার্থ,
কারণ তার ধর্ম শ্রবণ না করলে
ত্রিদিবে বাসও বিপত্তি মনে করি।”

এই অর্থ শুনে সুহৃদ ও দার সহ
বিষাদ ত্যাগ করে আমোদ পান রাজা।
“এবংবিধ তনয় আমার” মনে করে
ভাবেন তার মাঝে নিজের সারবত্তা।

কিন্তু আর্ষ মার্গে যাবে পুত্র এরকম
চিন্তায় তার হৃদয় হয়েছিল বিদ্ধ;
তিনি ধর্মপক্ষের প্রিয় না এমন না,
তবে সন্তাননাশের ভয় দেখেছিলেন।

অসিত মুনি নিবেদন করে এ তত্ত্ব
সুত নিয়ে সুতবিক্লব রাজার কাছে,
বহু চোখে ইক্ষমাণ শ্রদ্ধাভরা রূপে
তার আসা পবনের পথে চলে যান।

কৃতকাম তিনি অনুজার সুত দেখে
মুনির বচন শ্রবণে তন্ময় করান,
সাধুর বহুবিধ অনুকম্পায় তাকে
প্রিয় সুতের মতো করে বিনিয়োজিত।

এবং পুত্রের জন্মে তুষ্ট নরপতি
বিষয়গত বন্ধন বিমোচন করে
কুলসদৃশভাবে করেন যথাবৎ
জাতকর্ম তনয়ের, প্রিয় তনয়ের।

দশ দিন পরিণত হওয়ার পরেই
পরম আমোদে পূর্ণ সে প্রযতমনা
জপ হোম মঙ্গল আয়োজন করেন
সুতের পরম ভবে দেবতার তরে।

এমনকি শত সহস্র পূর্ণ সংখ্যায়,
স্থির বলবন্ত বাচ্চাসহ, স্বর্ণশৃঙ্গী,
জরা আসেনি এমন পয়স্বিনী দেন
সুতের বৃদ্ধির জন্য দ্বিজদের স্বয়ং।

নিয়তাত্মা রাজা বহুবিধ বিষয়ে
স্বহৃদয়তোষী ক্রিয়া বিধান করেন,
আর গুণে নিয়ত শিব মুহূর্ত ঠিক
করেন পুরে প্রবেশ করতে আমোদে।

হাতির দাঁতে বানানো মহামূল্যবান
সাদা সাদা পুষ্পে মণিপ্রদীপে শোভিত
শিবিকায় চড়েন দেবী শিবের জন্য
তনয় নিয়ে প্রণতি করে দেবতায়।

পুরে প্রবেশের আগে পত্নীকে করান
প্রবেশ অপত্য সহ স্থবিরদের সাথে,
তারপর নৃপতিও পৌরসংঘে যান,
দ্যুলোকে মঘবার মতো অর্চনা পান।

শাক্যরাজ করলেন ভবনে প্রবেশ,
যেন ষণ্মুখের জন্মে সে প্রতীত ভব,
এবং এভাবে তিনি হর্ষপূর্ণ বক্ত্রে
বহুবিধ পুষ্টি যশের কাজ করেন।

নরপতির এ পুত্রজন্মের বৃদ্ধিতে
কপিলা নামের সে জনপদের পুর
ধনদপুরের মতো অপ্সরায় অবকীর্ণ
আমোদিত, যেন জন্মেছে নলকুবের।

এবং ইতি বুদ্ধচরিত মহাকাব্য
ভগবতপ্রসূতি নামা প্রথম সর্গ।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *